খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ই জানুয়ারি ২০২৬, ৭:১৫ এএম

রাজধানীর গুলশানে নির্মাণাধীন বহুতল ভবন থেকে রড পড়ে মো. আশফাকুজ্জামান চৌধুরী (৩৫) নামের এক প্রকৌশলী নিহতের ঘটনায় আবাসন খাতের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান ‘কনকর্ড গ্রুপ’-এর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। তবে এই মৃত্যুকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে চাঞ্চল্যকর দাবি ও পাল্টা দাবি। কনকর্ড কর্তৃপক্ষ এই প্রাণহানির দায় অস্বীকার করে দাবি করেছে, ঘাতক রডটি তাদের প্রকল্প থেকে নয়, বরং পাশের ‘ক্রিস্টাল প্লেস’ ভবন থেকে পড়েছে। নির্মাণাধীন ভবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভয়াবহ অবহেলা এক সম্ভাবনাময় প্রাণ কেড়ে নিলেও দোষ কার, তা নিয়ে এখন চলছে আইনি ও প্রশাসনিক বিতর্ক।
Table of Contents
গত বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি, ২০২৬) দুপুরে গুলশান-১ নম্বরের ১৪০ নম্বর সড়কে দাঁড়িয়ে থাকাকালীন একটি রড আকাশ থেকে যেন মরণদূত হয়ে নেমে আসে আশফাকুজ্জামানের মাথায়। চট্টগ্রামের বাঁশখালীর সন্তান আশফাকুজ্জামান গুলশানের একটি বহুজাতিক সংস্থায় কর্মরত ছিলেন। এই মর্মান্তিক পরিণতির পর নিহতের শ্বশুর সিরাজুল ইসলাম তালুকদার বাদী হয়ে গুলশান থানায় মামলা করেন। মামলায় কনকর্ড গ্রুপের চেয়ারম্যান এস এম কামাল উদ্দিন ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহরিয়ার কামালসহ ১০-১২ জনকে আসামি করে ‘অপরাধমূলক গাফিলতি’র অভিযোগ আনা হয়েছে।
ঘটনা ও অভিযোগের তুলনামূলক চিত্র:
| বিষয়ের বিবরণ | বাদীর অভিযোগ ও প্রেক্ষাপট | কনকর্ড গ্রুপের পাল্টা দাবি |
| ঘাতক রডটির উৎস | কনকর্ডের নির্মাণাধীন এমবিআই স্কাইলাইন ভবন। | পাশের ক্রিস্টাল প্লেস ভবন থেকে পতন। |
| ঘটনার সময় কাজ | নির্মাণাধীন ভবনের কাজ চলছিল। | ক্রিস্টাল প্লেসে অনিরাপদ গ্লাস ক্লিনিং চলছিল। |
| নিরাপত্তা ত্রুটি | ভবনে পর্যাপ্ত সেফটি নেট বা জালি ছিল না। | অন্য ভবনের ছাদে আলগা রড পড়ে ছিল। |
| প্রধান আসামি | কনকর্ডের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক। | ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রমাণ রয়েছে। |
| ভিকটিমের অবস্থান | রাস্তার ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায়। | ক্রিস্টাল প্লেস ভবনের ঠিক নিচে অবস্থান। |
মামলায় সরাসরি অভিযুক্ত হলেও কনকর্ড গ্রুপ এক লিখিত বিবৃতিতে দাবি করেছে, তাদের ‘এমবিআই স্কাইলাইন’ ভবন থেকে রড পড়ার কোনো সুযোগ নেই। তাদের ভাষ্যমতে, ঘটনার সময় পাশের ‘ক্রিস্টাল প্লেস’ ভবনে অত্যন্ত বিপজ্জনকভাবে ঝুলন্ত প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে কাচ পরিষ্কারের কাজ চলছিল। সেই প্ল্যাটফর্ম বা ছাদ থেকেই একটি ছোট রড নিচে পড়ে যায়। কনকর্ড আরও অভিযোগ করেছে যে, দুর্ঘটনার পরপরই ক্রিস্টাল প্লেসের কর্মীরা তড়িঘড়ি করে তাঁদের যন্ত্রপাতি সরিয়ে ফেলেন। এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ার ভিডিও এবং ভিজ্যুয়াল প্রমাণ তাঁদের কাছে সংরক্ষিত আছে বলে তাঁরা দাবি করেছেন।
দুর্ঘটনার পর সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আশফাকুজ্জামান যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তার ঠিক উপরেই ক্রিস্টাল প্লেস ভবনটি অবস্থিত। অন্যদিকে, কনকর্ডের নির্মাণাধীন ভবনটি রাস্তার অন্য পাশে। পুলিশের গুলশান বিভাগের উপকমিশনার রওনক আলমসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, রডটি ঠিক কোন কোণ থেকে এবং কতটা উচ্চতা থেকে পড়েছে, তা নিশ্চিত হতে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ ও সিসিটিভি ফুটেজের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।
ঢাকা শহরের বহুতল ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা আইন মানার বালাই নেই বললেই চলে। একটি মূল্যবান জীবন ঝরে যাওয়ার পর এক ভবন অন্য ভবনের ওপর দোষ চাপিয়ে দায়মুক্ত হতে চাইছে। তদন্তে যদি কনকর্ডের গাফিলতি প্রমাণিত হয় কিংবা অন্য কোনো ভবনের অবহেলা বেরিয়ে আসে, তবে তাদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনা প্রয়োজন। নতুবা গুলশানের মতো এলাকায় ফুটপাত দিয়ে হাঁটাচলাও সাধারণ মানুষের জন্য মরণফাঁদে পরিণত হবে।
মন্তব্য