বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত যখন দীর্ঘস্থায়ী বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, তারল্যচাপ এবং খেলাপি ঋণের ক্রমবর্ধমান প্রবণতায় জর্জরিত, ঠিক সেই সময় রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংক লিমিটেড একটি ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ২০২৫ সালে কঠোর আর্থিক শৃঙ্খলা, জবাবদিহি জোরদারকরণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে ব্যাংকটি খেলাপি ঋণ আদায়, আমানত সংগ্রহ ও প্রবাসী আয় আহরণে একাধিক রেকর্ড গড়েছে।
ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা জানান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী মো. ওয়াহিদুল ইসলাম দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই খেলাপি ঋণ আদায় ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এর ফল হিসেবে ২০২৫ সালে শ্রেণিকৃত ও অবলোপিত ঋণ থেকে নগদ আদায় হয়েছে প্রায় ১,৩০০ কোটি টাকা, যা ওই বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। পাশাপাশি শীর্ষ ২০ জন বড় খেলাপির কাছ থেকে নগদ আদায় হয়েছে ৩৬১ কোটি টাকা এবং পুনঃতফসিল ও সমঝোতার মাধ্যমে আদায় হয়েছে আরও ১,৯৭৪ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে মোট আদায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২,৩৩৫ কোটি টাকা, যা রূপালী ব্যাংকের ইতিহাসে একটি মাইলফলক।
এই সাফল্যের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে মামলা ও আইনি কার্যক্রমের ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা। ঋণ আদায় সংক্রান্ত মামলাগুলো একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের আওতায় আনার ফলে প্রধান কার্যালয় থেকে তাৎক্ষণিক তদারকি সম্ভব হয়েছে, বেড়েছে স্বচ্ছতা ও কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নিষ্পত্তিকৃত মামলার সংখ্যা দাঁড়ায় ৮২৩টি, যেখানে আগের বছর এ সংখ্যা ছিল ৫৭১টি। একই সঙ্গে একজন প্রধান আইন উপদেষ্টা নিয়োগের মাধ্যমে আইনি সক্ষমতাও বাড়ানো হয়েছে।
এর প্রভাব পড়েছে ব্যাংকের সামগ্রিক সম্পদমানের ওপর। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ ১,৭১৬ কোটি টাকা কমে দাঁড়িয়েছে ১৯,৬৪১ কোটি টাকায়। একই সময়ে খেলাপি ঋণের হার ৪২ শতাংশ থেকে কমে ৩৮ শতাংশে নেমেছে এবং প্রভিশন ঘাটতিও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
খেলাপি ঋণ আদায়ের পাশাপাশি উৎপাদনমুখী খাতে ঋণ সম্প্রসারণেও অগ্রগতি দেখিয়েছে রূপালী ব্যাংক। ২০২৫ সালে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা খাতে নতুন ঋণ বিতরণ হয়েছে ১,৪৭০ কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ বার্ষিক বিতরণ। প্রযুক্তি খাতে ব্যাংকটি নিজস্ব মোবাইল ব্যাংকিং সেবা চালু করেছে এবং তথ্যপ্রযুক্তি আধুনিকায়নের লক্ষ্যে একজন প্রধান তথ্যপ্রযুক্তি কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
আমানত সংগ্রহেও ছিল শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি। বছরে নতুন হিসাব খোলা হয়েছে ৮ লাখ ৪৯ হাজারের বেশি এবং মোট আমানত বেড়েছে প্রায় ৩,৫০০ কোটি টাকা। পরিচালনা পর্ষদের নির্দেশনায় পরিচালিত ১০০ দিনের বিশেষ অভিযানে প্রায় ৬,৫০০ কোটি টাকা নতুন আমানত সংগ্রহ এবং প্রায় ৪ লাখ নতুন হিসাব খোলা সম্ভব হয়েছে। একই সময়ে ব্যাংকের মাধ্যমে প্রবাসী আয় এসেছে প্রায় ১৫,০০০ কোটি টাকা এবং নিয়ন্ত্রক মূলধন দাঁড়িয়েছে প্রায় ১,৭০০ কোটি টাকায়।
ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী মো. ওয়াহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, স্বল্পমেয়াদি সাফল্যের বাইরে গিয়ে একটি টেকসই, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর রূপান্তরই রূপালী ব্যাংকের মূল লক্ষ্য। বিশ্লেষকদের মতে, দৃঢ় নেতৃত্ব ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার ফলে রূপালী ব্যাংক ধীরে ধীরে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকিং খাতে আস্থার প্রতীক হিসেবে নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠন করছে।
২০২৫ সালে রূপালী ব্যাংকের প্রধান আর্থিক অর্জন
| সূচক | অর্জন (২০২৫) |
|---|---|
| শ্রেণিকৃত ও অবলোপিত ঋণ থেকে মোট আদায় | ২,৩৩৫ কোটি টাকা |
| মোট শ্রেণিকৃত ঋণ | ১৯,৬৪১ কোটি টাকা |
| খেলাপি ঋণের হার | ৩৮ শতাংশ |
| নতুন ক্ষুদ্র ও মাঝারি ঋণ বিতরণ | ১,৪৭০ কোটি টাকা |
| নতুন হিসাব খোলা | ৮,৪৯,০০০টির বেশি |
| আমানত বৃদ্ধি | প্রায় ৩,৫০০ কোটি টাকা |
| প্রবাসী আয় | প্রায় ১৫,০০০ কোটি টাকা |
