ভোটের উৎসব ও আচরণবিধি: প্রার্থীরা নামছেন মাঠে

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হওয়ার প্রেক্ষাপটে প্রার্থীদের জন্য কঠোর ‘রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা ২০২৫’ জারি করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এই বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো প্রার্থী বা সমর্থক যদি নিয়ম ভঙ্গ করেন, তবে জেল-জরিমানা থেকে শুরু করে চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রার্থিতা বাতিলের মতো কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে ইতোমধ্যে সারা দেশে জুডিশিয়াল ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা তদারকি শুরু করেছেন। ইসি সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, প্রচারণার নামে জনজীবনে বিঘ্ন সৃষ্টি বা নিয়ম লঙ্ঘন কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না।

প্রচারণার মাধ্যম ও উপকরণের বিধিনিষেধ

এবারের নির্বাচনে প্রচারণার উপকরণের ক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিধিমালা অনুযায়ী, প্রার্থীরা দেয়ালে কোনো ধরনের পোস্টার লাগাতে পারবেন না। তবে লিফলেট, হ্যান্ডবিল এবং কাপড়ের তৈরি ব্যানার বা ফেস্টুন ব্যবহার করা যাবে। পলিথিন, রেক্সিন বা পিভিসি (PVC) জাতীয় অপচনশীল উপকরণের ব্যানার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এছাড়া ব্যানারে কেবল প্রার্থী ও তাঁর দলীয় প্রধানের ছবি থাকতে পারবে; অন্য কোনো নেতার ছবি ব্যবহার আইনত দণ্ডনীয়।

নির্বাচনী প্রচারণার প্রধান বিধিনিষেধসমূহ একনজরে:

প্রচারণার ধরণঅনুমোদিত ও নিষিদ্ধ বিষয়াদি
পোস্টার ও ব্যানারদেয়ালে পোস্টার নিষিদ্ধ। ব্যানার হতে হবে কাপড় বা চটের। পলিথিন/পিভিসি নিষিদ্ধ।
যানবাহন ও শোডাউনবাস, ট্রাক, মোটরসাইকেল বা নৌযান নিয়ে কোনো মিছিল বা শোডাউন করা যাবে না।
যাতায়াত ও ড্রোনহেলিকপ্টার ব্যবহার নিষিদ্ধ (ব্যতিক্রম: দলীয় প্রধান)। ড্রোনের ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
জনসভাস্থান ও সময় সম্পর্কে অন্তত ২৪ ঘণ্টা আগে স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।
বিলবোর্ডপ্রতি ওয়ার্ডে (ইউনিয়ন/পৌরসভা/সিটি কর্পোরেশন) সর্বোচ্চ একটি বিলবোর্ড স্থাপনযোগ্য।
ব্যক্তিগত আক্রমণপ্রতিপক্ষের চরিত্র হনন, উসকানিমূলক বক্তব্য বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত নিষিদ্ধ।

ডিজিটাল প্রচারণা ও এআই (AI) সংক্রান্ত কড়া নিয়ম

তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার রোধে এবার কঠোর ও যুগোপযোগী নিয়ম যুক্ত করা হয়েছে। কোনো প্রার্থী বা তাঁর প্রতিনিধি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা শুরু করার আগে তাঁদের অ্যাকাউন্ট আইডি এবং ইমেইল সংক্রান্ত তথ্য রিটার্নিং অফিসারের কাছে জমা দিতে হবে।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (Artificial Intelligence) এর অপব্যবহার রোধে কঠোর ধারা যুক্ত করা হয়েছে। কোনো প্রার্থীর চেহারা বিকৃত করা (Deepfake), কণ্ঠস্বর নকল করা বা এআই ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘৃণা বা বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য (Hate Speech) ছড়ালে বা নারী ও সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে কোনো কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সত্যতা যাচাই ছাড়া কোনো কন্টেন্ট শেয়ার করাও অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

যানবাহন ও মিছিল সংক্রান্ত বিধি

নির্বাচনী জনসভা বা মিছিলে জনভোগান্তি কমাতে যানবাহন ব্যবহারের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। কোনো যান্ত্রিক যানবাহনের বহর নিয়ে মিছিল বা শোডাউন করা যাবে না। এছাড়া মশাল মিছিল বা এ জাতীয় কোনো কর্মকাণ্ড যা জনমনে ভীতি তৈরি করতে পারে, তা আইনত দণ্ডনীয়। নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানিয়েছেন, আচরণ বিধিমালা প্রতিপালনে কোনো শিথিলতা দেখানো হবে না। প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় জুডিশিয়াল ও বিচারিক কমিটি এবং মোবাইল কোর্ট সার্বক্ষণিক সক্রিয় থাকবে।

উপসংহার

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে একটি স্বচ্ছ ও আধুনিক মডেলে রূপান্তর করতে চায় নির্বাচন কমিশন। প্রচারণায় সবার জন্য সমান সুযোগ (Level Playing Field) নিশ্চিত করাই এই আচরণবিধির মূল লক্ষ্য। প্রার্থীরা যদি পেশাদারিত্বের সাথে এই নিয়মগুলো মেনে চলেন, তবে ভোটাররা একটি সহিংসতামুক্ত এবং উৎসবমুখর পরিবেশ পাবেন। নাগরিকদের প্রত্যাশা, নিয়ম ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কমিশন যেন দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করে।