কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের শূন্যরেখায় টানা ৯৬ ঘণ্টা (চার দিন) অবরুদ্ধ থাকার পর পুশইনের শিকার সুমি আক্তার ও তাঁর দুই শিশু সন্তানসহ পরিবারের চার সদস্য নিখোঁজ হয়েছেন। গত ১৪ জুন থেকে সীমান্তে আটকে থাকা মোট ৯ জন নাগরিকের মধ্যে সুমি আক্তারের চার সদস্যের পরিবারটিকে আজ বৃহস্পতিবার (১৮ জুন, ২০২৬) সকাল থেকে আর দেখা যাচ্ছে না। তবে তারা বর্তমানে কোথায় আছেন, সে বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্বশীল কোনো দপ্তর বা সীমান্তরক্ষী বাহিনী নিশ্চিত করে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেনি।
Table of Contents
নিখোঁজ পরিবারের পরিচয় ও ঘটনার বিবরণ
সীমান্তে আটকে পড়া এবং পরবর্তীতে নিখোঁজ হওয়া এই চারজন হলেন:
সুমি আক্তার ও তাঁর স্বামী বিল্লাল হোসেন।
তাঁদের চার বছর বয়সী কন্যা শিশু ফাতেমা।
তাঁদের পাঁচ মাস বয়সী দুগ্ধপোষ্য কন্যাসন্তান সুমাইয়া।
স্থানিয় সূত্র ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গত ১৪ জুন ভোরে আন্তর্জাতিক ১০৬০ মেইন পিলারের ১-এস সাব-পিলারের পাশ দিয়ে ভারতের আসাম রাজ্যের দক্ষিণ শালমারা-মানকাচর জেলার ঝালোরচর ক্যাম্পের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ) সদস্যরা এই পরিবারটিসহ অন্যান্যদের বাংলাদেশে পুশইনের (জোরপূর্বক পুশব্যাক) চেষ্টা চালায়।
একই সময়ে পাশের আন্তর্জাতিক ১০৬৬ মেইন পিলার সংলগ্ন ভন্দুচর এলাকা দিয়ে আরও ৩ যুবকসহ মোট ৯ জনকে পুশইনের চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও স্থানীয় সীমান্তের সাধারণ জনতার তীব্র বাধার মুখে বিএসএফের সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। ফলে সুমির পরিবারসহ মোট ৯ জন সীমান্তের শূন্যরেখার ভারতীয় অংশে খোলা আকাশের নিচে আটকে পড়েন।
অসুস্থতা ও নিখোঁজ হওয়ার পূর্বের ঘটনা
আন্তর্জাতিক সীমান্তের শূন্যরেখায় টানা চার দিন ধরে অনাহার ও তীব্র রোদে অবস্থান করার ফলে সুমি আক্তারের পরিবারটি চরম খাদ্যসংকট ও পুষ্টিহীনতায় ভুগে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। বিজিবির দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, সবশেষ গতকাল বুধবার (১৭ জুন) রাত আনুমানিক ১২টার দিকে সুমির পরিবারটির শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটলে বিজিবির পক্ষ থেকে মানবিক কারণে শূন্যরেখায় তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করা হয়। চিকিৎসা শেষে বিজিবির সদস্যরা তাদের প্রয়োজনীয় খাবার সরবরাহ করেছিলেন।
তবে আজ বৃহস্পতিবার সকাল থেকে সুমির পরিবারটিকে আর সেই নির্দিষ্ট স্থানে দেখা যায়নি। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভোরের দিকে আন্তর্জাতিক সীমান্তের শূন্যরেখার কাছাকাছি বিজিবির একটি নিয়মিত টহল গাড়ি এবং অন্য একটি আলাদা সাদা রঙের ব্যক্তিগত গাড়ি দেখা গিয়েছিল। সেই গাড়ি দুটি চলে যাওয়ার পর থেকেই সুমির চার সদস্যের পরিবারটি সম্পূর্ণ নিখোঁজ রয়েছে। স্বামী আর দুই কন্যাসন্তানসহ সুমি আক্তার বর্তমানে বিজিবি নাকি বিএসএফের হেফাজতে আছেন, তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
प्रत्यक्षদর্শী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধির বক্তব্য
শৌলমারী ইউনিয়ন পরিষদের স্থানীয় সদস্য (ইউপি সদস্য) মো. সোনা মিয়া সীমান্তের উদ্ভূত পরিস্থিতি সম্পর্কে জানান, বুধবার গভীর রাতে তিনি তাঁর পাটক্ষেতের পাশে বিজিবি এবং বিএসএফের জোয়ানদের দুই দেশের পতাকা হাতে নিয়ে দ্বিপাক্ষিক পতাকা বৈঠকে (ফ্ল্যাগ মিটিং) কথা বলতে দেখেছেন। এই আলোচনার পর আজ বৃহস্পতিবার সকালে তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখেন সুমির পরিবারটি সেখানে নেই। তবে ওই পরিবারটি নিখোঁজ হলেও পুশইনের শিকার হওয়া বাকি ৫ জন পুরুষ এখনও সীমান্তের শূন্যরেখায় আগের মতোই অবরুদ্ধ অবস্থায় অবস্থান করছেন।
প্রশাসনের বক্তব্য ও প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান
পরিবারটি নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে রৌমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাওসার আলী সংবাদমাধ্যমকে জানান, সুমির পরিবারের বর্তমান অবস্থান বা তাদের বিষয়ে পুলিশ কিছুই জানে না। বিজিবি বা অন্য কোনো সংস্থা তাদের থানায় হস্তান্তর করেনি বা নিয়ে আসেনি।
总体 অন্যদিকে, জামালপুর-৩৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসানুর রহমান ঘটনার বিষয়ে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক বক্তব্য প্রদান করেছেন। তিনি জানান, বুধবার রাতে সুমির পরিবারটি চরম অসুস্থ হয়ে পড়ায় মানবিক দিক বিবেচনা করে বিজিবির পক্ষ থেকে ভারতের সীমানায় গিয়ে তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল। এরপর বৃহস্পতিবার সকালে বিজিবির সদস্যরা নিয়মিত টহলের অংশ হিসেবে সীমান্তে গমন করেন। পরিবারটি বর্তমানে কোথায় আছে বা তাদের বিএসএফ ফেরত নিয়ে গেছে কি না, সে বিষয়ে বিজিবির কাছে আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য নেই। বাকি ৫ জনের বিষয়ে সীমান্তে নজরদারি ও আইনি প্রক্রিয়া বজায় রয়েছে।
