খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ই মে ২০২৬, ১০:১৩ এএম

বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের সর্ববৃহৎ ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-এর আর্থিক স্বাস্থ্য চরম অবনতির মুখে পড়েছে। ২০২৫ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকটির শ্রেণিকৃত বা খেলাপি ঋণের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় ৪৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৯৪,৩২২ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এটি বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে কোনো একক ব্যাংকের ক্ষেত্রে খেলাপি ঋণের সর্বোচ্চ পরিমাণ।
Table of Contents
২০২৫ সাল শেষে ইসলামী ব্যাংকের মোট ঋণ বিনিয়োগের ৫১ শতাংশই এখন খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ২০২৪ সালে এই হারের পরিমাণ ছিল ৪২ দশমিক ৩৬ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, উক্ত সময়ে দেশের পুরো ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ দশমিক ৫৭ লাখ কোটি টাকা। এর ফলে দেখা যাচ্ছে যে, দেশের মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ১৭ শতাংশই এককভাবে এই ব্যাংকের দখলে। দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণ থাকা জনতা ব্যাংকের ঋণের পরিমাণ ছিল ৭২,৮০৪ কোটি টাকা।
ব্যাংকটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের মতে, এস আলম গ্রুপের সাথে সংশ্লিষ্ট “গোপন” ঋণের তথ্য প্রকাশিত হওয়ায় এই নাটকীয় বৃদ্ধি ঘটেছে। পূর্ববর্তী ব্যবস্থাপনা এই অনিয়মগুলো পরিকল্পিতভাবে গোপন করলেও বর্তমান কর্তৃপক্ষ প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করায় এই বিশাল অংক সামনে এসেছে।
নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান মাহফেল হক অ্যান্ড কোম্পানি ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থার উপর একটি পর্যবেক্ষণ দিয়েছে। তাদের মতে, ব্যাংকটির অনাদায়ী সম্পদের বিপরীতে প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি বা প্রভিশন রাখার ক্ষেত্রে বিশাল ঘাটতি রয়েছে।
| নির্দেশক | প্রয়োজনীয় পরিমাণ (কোটি টাকা) | রক্ষিত পরিমাণ (কোটি টাকা) | ঘাটতি (কোটি টাকা) |
| নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) | ৯২,৫৩৭.৫৬ | ৭,৯২২.৪১ | ৮৪,৬১৫.১৫ |
| ঝুঁকিভিত্তিক মূলধন | ১৯,২০০.৯১ | ৯,৮৫৫.১৯ | ৯৩,৯৬০.৯২* |
*প্রকৃত সঞ্চিতি ঘাটতি সমন্বয় করার পর হিসাবকৃত মূলধন ঘাটতি।
নিরীক্ষকদের মতে, বিশাল এই সঞ্চিতি ঘাটতি আমলে না নেওয়ায় ব্যাংকটির সম্পদ ও মুনাফাকে অনেক বেশি এবং দায়কে অনেক কম করে দেখানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইসলামী ব্যাংক বর্তমানে কেবলমাত্র বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ নীতিগত সহায়তার কারণে টিকে আছে। এই বিশেষ ছাড় বা সহায়তা না থাকলে ব্যাংকটির ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া বা সচল থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ত। নিয়ম অনুযায়ী ব্যাংকটির মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ হওয়া বাধ্যতামূলক হলেও ব্যাংকটি মাত্র ৬ দশমিক ৪২ শতাংশ দেখাতে সক্ষম হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ হস্তক্ষেপ না থাকলে ২০২৫ সালে ব্যাংকটির এককভাবে ৮৪,৫০৭ দশমিক ৮৩ কোটি টাকা লোকসান হতো।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০২৬ সালের ২৮ এপ্রিল ব্যাংকটিকে পূর্ণ সঞ্চিতি সমন্বয় ছাড়াই আর্থিক বিবরণী চূড়ান্ত করার অনুমতি দেয়। তবে শর্ত হিসেবে এক মাসের মধ্যে এই ঘাটতি মোকাবিলায় একটি সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ব্যাংকটির এই বিপর্যয়ের নেপথ্যে প্রধানত এস আলম গ্রুপের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ দায়ী। প্রতিবেদনে উল্লিখিত বড় ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে রয়েছে:
এস আলম ভেজিটেবল অয়েল: ১৪,৮৯৯ কোটি টাকা।
এস আলম সুপার এডিবল অয়েল: ১২,৯৮৩ কোটি টাকা।
এস আলম স্টিলস এবং রিফাইনড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ: ১০,৩৯৪ কোটি টাকা।
২০২৫ সালে ব্যাংকটির নিট বিনিয়োগ আয় ৪০ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ১,৮৪৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। মুনাফা সংকটে টানা দ্বিতীয় বছর লভ্যাংশ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় শেয়ারবাজারে ব্যাংকটিকে ‘জেড’ বা অযোগ্য শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকটির ৩২ টাকা ৬০ পয়সা মূল্যের শেয়ার লেনদেন প্রায় স্থবির হয়ে আছে। উল্লেখ্য যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশে এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন ব্যাংকটির প্রায় ৮৩ শতাংশ শেয়ার ইতোমধ্যে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। এই বিশাল আর্থিক ঘাটতি কাটিয়ে ওঠা এখন ব্যাংকটির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
মন্তব্য