খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৫ই জুলাই ২০২৬, ২:৫০ পিএম

মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ছোড়া একটি গুলি শরীরে নিয়েই জীবনের দীর্ঘ ৫৫ বছর পার করেছেন নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার প্রবীণ মন্নাস আলী। অবশেষে চিকিৎসকদের সফল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার শরীর থেকে সেই গুলিটি অপসারণ করা হয়েছে। দীর্ঘদিনের শারীরিক কষ্টের অবসান হওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন তিনি ও তার পরিবার।
শনিবার (৪ জুলাই) দুপুরে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এ অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. তানজিরুল ইসলাম রায়হানের নেতৃত্বে চিকিৎসকদের একটি দল প্রায় ৩০ মিনিটের অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে মন্নাস আলীর পেটে থাকা গুলিটি সফলভাবে বের করেন। অস্ত্রোপচারের পর তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে এবং সুস্থতার লক্ষণও ইতিবাচক।
বর্তমানে ৭৫ বছর বয়সী মন্নাস আলীর বাড়ি দুর্গাপুর উপজেলার গাঁওকান্দিয়া ইউনিয়নের হরিয়াউন্দ গ্রামে। তার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই ঘটনাটি মুক্তিযুদ্ধের বিভীষিকাময় সময়ের এক নির্মম স্মৃতি বহন করে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবারের সদস্যদের বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৭১ সালে দুর্গাপুর এলাকায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী একটি সামরিক ক্যাম্প স্থাপন করেছিল। সে সময় গাঁওকান্দিয়া ইউনিয়নে এক বীর মুক্তিযোদ্ধা তিনজন পাকিস্তানি সেনাকে হত্যা করে তাদের মরদেহ মাটিচাপা দেন। এর প্রতিশোধ নিতে হানাদার বাহিনী আশপাশের গ্রামগুলোতে ভয়াবহ অভিযান চালায়।
সেই অভিযানে নিরীহ গ্রামবাসীর ওপর নেমে আসে অকথ্য নির্যাতন। স্থানীয়দের দাবি, অর্ধশতাধিক মানুষকে ঘরের ভেতরে আটকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। একই সঙ্গে নির্বিচারে গুলি চালানো হলে বহু মানুষ প্রাণ হারান এবং অনেকে প্রাণ বাঁচাতে গ্রাম ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করেন।
মন্নাস আলীও সেদিন প্রাণ রক্ষার জন্য দৌড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বের হয়েছিলেন। কিন্তু পালানোর সময় পাকিস্তানি সেনাদের ছোড়া একটি গুলি তার পেটে বিদ্ধ হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তিনি প্রাণে বেঁচে গেলেও প্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার আর করানো সম্ভব হয়নি। পরিবারের আর্থিক সংকট, চিকিৎসাসেবার সীমিত সুযোগ এবং যুদ্ধ-পরবর্তী প্রতিকূল বাস্তবতার কারণে শরীরের ভেতরে থাকা গুলিটি আর অপসারণ করা যায়নি। ফলে দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে সেই গুলি নিয়েই তাকে জীবন কাটাতে হয়েছে।
সম্প্রতি তার শরীরে মুক্তিযুদ্ধকালীন গুলি রয়ে যাওয়ার বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আলোচনায় আসে। বিষয়টি বিভিন্ন মহলের নজরে এলে চিকিৎসকেরা প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। পরীক্ষায় গুলিটির অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
চিকিৎসকদের পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্ধারিত দিনে সফল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয় এবং প্রায় ৫৫ বছর ধরে শরীরে থাকা গুলিটি অপসারণ করা সম্ভব হয়। চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘদিন শরীরে কোনো ধাতব বস্তু থেকে গেলে তা ব্যথা, অস্বস্তি কিংবা বিভিন্ন শারীরিক জটিলতার কারণ হতে পারে। তাই রোগীর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
মন্নাস আলীর স্বজনরা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিনের শারীরিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি মানসিকভাবেও অনেকটা স্বস্তি অনুভব করছেন। তাদের আশা, চিকিৎসকদের পরামর্শ মেনে চললে তিনি দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন।
মুক্তিযুদ্ধের অগণিত অজানা ও অবহেলিত স্মৃতির মতো মন্নাস আলীর জীবনও ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষ্য বহন করে। স্বাধীনতার অর্ধশতকেরও বেশি সময় পর তার শরীর থেকে যুদ্ধের সেই ক্ষতচিহ্ন অপসারণ হলেও, ১৯৭১ সালের বর্বরতার স্মৃতি এবং সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগ দেশের ইতিহাসে চিরকাল অমলিন হয়ে থাকবে।
মন্তব্য