১৯৬৬ বিশ্বকাপের বিতর্কিত গোল ও নানা ঘটনা সমগ্র

১৯৩০ সালে মন্টেভিডিওতে বিশ্বকাপ ফুটবলের যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, শতবর্ষের দোরগোড়ায় এসে সেই ইতিহাস নানা স্মৃতি, বিতর্ক ও অবিস্মরণীয় ঘটনার সমষ্টিতে পরিণত হয়েছে। পেলে, গারিঞ্চা, ম্যারাডোনা, জিদান এবং মেসিদের নৈপুণ্যে গড়া এই প্রতিযোগিতা যেমন ক্রীড়ার উৎকর্ষ দেখিয়েছে, তেমনি বিতর্কও রেখে গেছে সমানভাবে। এর মধ্যে ১৯৬৬ সালের ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ বিশেষভাবে আলোচিত, যেখানে স্বাগতিক ইংল্যান্ড প্রথম ও একমাত্র শিরোপা জয় করলেও বহু ঘটনা আজও প্রশ্নবিদ্ধ।

ইংল্যান্ড তাদের সব ম্যাচ লন্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে খেলেছিল, যা টুর্নামেন্টে অনন্য সুবিধা হিসেবে বিবেচিত হয়। ইংল্যান্ড ও পর্তুগালের সেমিফাইনাল প্রথমে লিভারপুলে নির্ধারিত থাকলেও শেষ মুহূর্তে তা ওয়েম্বলিতে স্থানান্তর করা হয়, দর্শকসংখ্যা বাড়ানোর যুক্তিতে। এই সিদ্ধান্ত ঘিরেও আলোচনা সৃষ্টি হয়।

ফাইনালে ইংল্যান্ডের প্রতিপক্ষ ছিল পশ্চিম জার্মানি। নির্ধারিত সময়ে ম্যাচ ২-২ সমতায় শেষ হওয়ার পর অতিরিক্ত সময়ে জিওফ হার্স্টের একটি শট ক্রসবারে লেগে গোললাইন সংলগ্ন এলাকায় পড়ে। জার্মান খেলোয়াড়রা বল ক্লিয়ার করলেও রেফারি গোল ঘোষণা করেন। পরে হার্স্ট হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন এবং ইংল্যান্ড ৪-২ গোলে জয়ী হয়। তবে ওই একটি গোল আজও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত।

রেফারিং নিয়েও ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড ম্যাচে আর্জেন্টাইন অধিনায়ক আন্তোনিও রাত্তিনকে মাঠ থেকে বের করে দেওয়া হয়, যদিও ভাষাগত কারণে তিনি সিদ্ধান্তের কারণ বুঝতে পারেননি। একইভাবে বিভিন্ন ম্যাচে ইউরোপীয় রেফারিদের সিদ্ধান্ত নিয়ে দক্ষিণ আমেরিকান দেশগুলো পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তোলে।

১৯৬৬ বিশ্বকাপের প্রধান বিতর্ক ও ঘটনা

ঘটনাবিবরণপ্রভাব
বিতর্কিত গোলফাইনালে জিওফ হার্স্টের শট গোল হিসেবে গণ্যইংল্যান্ডের শিরোপা জয়ে বিতর্ক সৃষ্টি
ওয়েম্বলি সুবিধাসব ম্যাচ একই স্টেডিয়ামে খেলেছে ইংল্যান্ডস্বাগতিক সুবিধা নিয়ে প্রশ্ন
সেমিফাইনাল স্থানান্তরলিভারপুল থেকে ওয়েম্বলিতে ম্যাচ সরানোপ্রতিযোগিতার ভারসাম্য নিয়ে বিতর্ক
রেফারি সিদ্ধান্তআর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ের ম্যাচে বিতর্কিত কার্ডপক্ষপাতিত্বের অভিযোগ
পেলেকে আঘাতপর্তুগালের বিপক্ষে ফাউলজনিত চোটব্রাজিলের গ্রুপ পর্বে বিদায়
কার্ড ব্যবস্থার সূচনাহলুদ ও লাল কার্ডের ধারণা তৈরিপরবর্তীতে আনুষ্ঠানিক নিয়মে অন্তর্ভুক্ত

টুর্নামেন্টে আরও বহু অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। ইংল্যান্ডের উদ্বোধনী ম্যাচ শুরুর আগে কয়েকজন খেলোয়াড় পরিচয়পত্র হোটেলে রেখে আসায় খেলা কিছুক্ষণ বিলম্বিত হয়। পরে পুলিশ মোটরসাইকেলে করে তা নিয়ে আসে। দর্শকদের জন্য ওয়েম্বলিতে বিপুল পরিমাণ খাদ্য ও পানীয় সরবরাহ করা হয়, যা সে সময়ের আয়োজনের বিশালতাকেও নির্দেশ করে।

বিভিন্ন দলের খাদ্যাভ্যাস ও প্রস্তুতিতেও ভিন্নতা দেখা যায়। পর্তুগাল, ফ্রান্স, মেক্সিকো, হাঙ্গেরি ও উরুগুয়ের দল আলাদা আলাদা খাদ্য ও শৃঙ্খলা অনুসরণ করেছিল, যা টুর্নামেন্টের সামাজিক দিককেও আলাদা মাত্রা দেয়।

১৯৬৬ সালের এই বিশ্বকাপ কেবল একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ছিল না; এটি ছিল কৌশল, বিতর্ক, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক ক্রীড়া রাজনীতির এক জটিল প্রতিচ্ছবি। ফুটবলের ইতিহাসে এটি আজও আলোচিত অধ্যায় হিসেবে স্থান করে আছে।