খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ই জুন ২০২৬, ১০:৩১ পিএম

দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ও নানামুখী জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে সুইজারল্যান্ডে মুখোমুখি দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। দুই দেশের মধ্যে চলমান বিদ্যমান উত্তেজনা প্রশমিত করা এবং সম্প্রতি অর্জিত একটি অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতাকে আরও কার্যকরভাবে সামনে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে এই উচ্চপর্যায়ের আলোচনা শুরু হয়েছে। রোববার (২১ জুন) সুইজারল্যান্ডের লেক লুসার্ন এলাকায় এই উচ্চপর্যায়ের যৌথ কমিটির প্রথম বৈঠকটি আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের সূচনাপর্বের বিষয়টি বিশ্ব গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছে। এই বিশেষ সংলাপে অংশ নেওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাশাপাশি চলমান শান্তি প্রক্রিয়ার অন্যতম দুই মধ্যস্থতাকারী দেশের প্রতিনিধিরাও সশরীরে এতে অংশগ্রহণ করছেন।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতা স্বাক্ষরিত হয়েছিল। মূলত শীর্ষ দুই নেতার মধ্যে হওয়া সেই সমঝোতার ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এবং তা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের পথ সুগম করতেই সুইজারল্যান্ডে এই উচ্চপর্যায়ের ফলো-আপ বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে। তবে বৈঠকের আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হতেই দুই দেশের মধ্যকার বেশ কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, স্পর্শকাতর ও দীর্ঘদিনের জটিল ইস্যু টেবিল আলোচনার সামনে চলে এসেছে। এসকল অমীমাংসিত বিষয়ে প্রথম থেকেই উভয় পক্ষ নিজেদের কৌশলগত অবস্থানে অনড় রয়েছে।
সুইজারল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই উচ্চপর্যায়ের সংলাপে সংশ্লিষ্ট চার দেশের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিদল বর্তমানে লেক লুসার্নের একটি সুরক্ষিত ও বিশেষ রিসোর্টে অবস্থান করছেন। সেখানেই অত্যন্ত নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার সাথে এই কূটনৈতিক রুদ্ধদ্বার আলোচনা ও পর্যালোচনা অব্যাহত রয়েছে। এই সংলাপে মার্কিন প্রতিনিধিদলের মূল নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। অন্যদিকে, ইরানের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের প্রধান হিসেবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। এই দুই দেশের মধ্যে সফল মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাতার ও পাকিস্তানের বিশেষ প্রতিনিধি ও কূটনীতিবিদেরাও এই আন্তর্জাতিক আলোচনা টেবিলে উপস্থিত থেকে প্রয়োজনীয় সমন্বয় ও দিক নির্দেশনা দিচ্ছেন।
বৈঠকের প্রাথমিক আলোচ্যসূচিতে বেশ কয়েকটি স্পর্শকাতর অর্থনৈতিক, আর্থিক ও কৌশলগত বিষয় স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে প্রধান বিষয়গুলো হলো মধ্যপ্রাচ্যের বাণিজ্যিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল নৌপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহনের জন্য উন্মুক্ত করা, ইরানের তেল রপ্তানির ওপর দীর্ঘদিন ধরে আরোপিত মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের বিপুল পরিমাণ আর্থিক সম্পদ ও জাতীয় রিজার্ভ অবমুক্ত করার প্রক্রিয়া সহজতর করা।
সুইজারল্যান্ডে অবস্থানরত ইরানি প্রতিনিধিদলে দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ছাড়াও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে উপস্থিত রয়েছেন দেশটির উপতেলমন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন কঠোর অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বিশ্বজুড়ে নিজেদের আটকে থাকা জাতীয় আর্থিক সম্পদ দ্রুত মুক্ত করার বিষয়টিকে এই মুহূর্তে সবকিছুর ঊর্ধ্বে রেখে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে তেহরান। এ কারণেই তেল ও ব্যাংকিং খাতের শীর্ষ কর্তাদের এই প্রতিনিধিদলে যুক্ত করা হয়েছে।
এই দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক আলোচনা শুরু হলেও বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার আগের সিদ্ধান্ত থেকে এখনই সরে আসেনি ইরান। তেহরানের পক্ষ থেকে স্পষ্ট দাবি করা হয়েছে যে, লেবাননে চলমান সামরিক সংঘাত নিরসনে এবং সেখানে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় আন্তর্জাতিক মহলের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো প্রকার কার্যকর বা দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
ইরানের নীতি নির্ধারণী মহলের মতে, লেবানন সংকট নিরসন না হওয়া পর্যন্ত তারা হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার এই কঠোর সামরিক অবস্থান বজায় রাখবে এবং ইরান এই আঞ্চলিক বিষয়টিকে বর্তমান সামগ্রিক দ্বিপাক্ষিক আলোচনার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে।
অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে মূল এজেন্ডার বাইরেও আলোচনা টেবিলে লেবানন সংকট ও সেখানে একটি সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার বিষয়টি অন্যতম গুরুত্ব পেয়েছে বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতা ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। কাতার ও পাকিস্তানের সরাসরি মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিত এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক থেকে শেষ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো কোনো স্থায়ী ও গ্রহণযোগ্য সমঝোতা বেরিয়ে আসে কি না, সেদিকেই এখন নিবিড়ভাবে নজর রাখছে আন্তর্জাতিক মহল ও বিশ্ব গণমাধ্যম।
মন্তব্য