জি- লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ৮ই আগস্ট ২০২৬, ১০:৫ পিএম

‘ও বাবা, বাবারে! তোক মারলে বাবা পুলিশে, এই পীরগাছার পুলিশে মারলে বাবা। টাকা খায়া মারলে বাবাক।’ অ্যাম্বুলেন্সে রাখা সন্তানের লাশের ওপর ঢলে পড়ে বৃদ্ধ বাবা জাফর আলী বকসীর এই করুণ আহাজারিতে ভারি হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। নিহতের নাম মোনারুল ইসলাম বকসী (২৯)। তিনি সাভার থানা ছাত্রদলের সহসভাপতির দায়িত্বে ছিলেন। সাভারে পুলিশের একটি অভিযানের সময় ভবনের ছাদ থেকে নিচে পড়ে তাঁর এই রহস্যজনক মৃত্যু ঘটে। এই মর্মান্তিক ঘটনার প্রতিবাদে এবং সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে রংপুরের পীরগাছা থানার সামনে লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স রেখে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করেছেন নিহতের স্বজনসহ ক্ষুব্ধ শতাধিক গ্রামবাসী।
ঘটনার শিকড় লুকিয়ে আছে পীরগাছা থানার একটি নিখোঁজ ডায়েরির তদন্তে। সাভারের বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (বিপিএটিসি) আবাসিক ভবনে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে চাকরি করেন নিহতের বাবা জাফর আলী। সেখানেই বাবার নির্ধারিত সরকারি ফ্ল্যাটে থাকতেন মোনারুল। তাঁদের মূল বাড়ি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ হাতিবান্ধা গ্রামে। পীরগাছা থানায় দায়ের হওয়া একটি নিখোঁজ কিশোরীর সাধারণ ডায়েরির (জিডি) সূত্রে ধরে তথ্য পাওয়া যায় যে, মেয়েটি সাভারে মোনারুলদের ফ্ল্যাটে অবস্থান করছে। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই সাভার মডেল থানা ও পীরগাছা থানা-পুলিশ যৌথভাবে গত বৃহস্পতিবার রাতে ওই ফ্ল্যাটে অভিযানে যায়।
নিহতের পরিবারের দাবি, ওই কিশোরীর সঙ্গে মোনারুলের এক ভাগনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল এবং তারা নিজেরাই স্বেচ্ছায় বিয়ে করে সাভারে সংসার শুরু করেছিল। অভিযানের সময় পীরগাছা থানার পুলিশ দলটির সঙ্গে নিখোঁজ মেয়েটির বাবা মিন্টুও উপস্থিত ছিলেন। ফ্ল্যাটে যখন দুপক্ষের মধ্যে প্রচণ্ড কথা-কাটাকাটি ও বাকবিতণ্ডা চলছিল, ঠিক তখনই হঠাৎ ছাদ থেকে নিচে কিছু আছড়ে পড়ার তীব্র শব্দ হয়। পরে নিচে গিয়ে মোনারুলকে রক্তাত ও অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। সেখান থেকে তাঁকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহতের পরিবারের স্পষ্ট অভিযোগ, এটি কোনো সাধারণ দুর্ঘটনা কিংবা আত্মহত্যার ঘটনা নয়, বরং এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। নিহত মোনারুলের বড় ভাই মমদেল হোসেন বকসীর দাবি, অভিযানের সুযোগ নিয়ে কিশোরীর বাবা মিন্টু পুলিশ সদস্যদের সহযোগিতায় মোনারুলকে ছাদে নিয়ে যান। সেখানে বিবাদের একপর্যায়ে তাঁকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে ছাদ থেকে নিচে ফেলে দেওয়া হয়। এরপর মোনারুল নিচে পড়ে গেলে উদ্ধার করার নাম করে হাসপাতাল পাঠানোর কথা বলে মূল অভিযুক্ত ও পুলিশ সদস্যরা দ্রত কেটে পড়েন।
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষ হওয়ার পর মরদেহ স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দেয় সাভার থানা-পুলিশ। এরপর মরদেহ নিয়ে গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধায় নিয়ে যাওয়ার সময় আজ শনিবার সকাল আটটার দিকে পীরগাছা থানার সামনে অবস্থান নেয় লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স। খবর পেয়ে নিহতের গ্রাম ও আশপাশের এলাকা থেকে প্রায় দেড় শতাধিক মানুষ এসে থানার সামনে জড়ো হয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে থাকেন। এতে পুরো পীরগাছা থানা চত্বরে চরম উত্তেজনা ও অচলাবস্থা তৈরি হয়। খবর পেয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা এগিয়ে আসেন এবং পুলিশের সাথে কথা বলে পরিবারের ক্ষোভ প্রশমিত করেন।
পীরগাছা উপজেলা ছাত্রদলের সদস্যসচিব মোফাচ্ছিরুল ইসলাম বলেন, মোনারুল দলের একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মী ছিলেন। তাঁর এই অকাল ও রহস্যজনক মৃত্যুর পেছনে কারা জড়িত, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার করা দরকার। কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন অহেতুক হয়রানির শিকার না হন, আবার মূল অপরাধীরাও যেন কোনো ছাড় না পায়, সে ব্যাপারে ছাত্রদল সোচ্চার থাকবে।
অন্যদিকে পীরগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সেলিম মালিক জানান, স্বজনরা মূলত অভিযানের সার্বিক তথ্য এবং কার নির্দেশে পুলিশ সেখানে গিয়েছিল, তা জানার জন্যই এসেছিলেন। তাদের যাবতীয় প্রশ্নের জবাব দেওয়া এবং তথ্য দিয়ে আশ্বস্ত করার পর তারা সেখান থেকে ফিরে যান। শনিবার দুপুরের পর গ্রামের বাড়িতে পারিবারিক কবরস্থানে মোনারুলের দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে।
সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল আলম জানান, অনাকাঙ্ক্ষিত এই ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে ইতোমধ্যেই পাঁচ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। নিহতের পরিবার দাফন-কাফনের কাজে ব্যস্ত থাকায় এখন পর্যন্ত লিখিত কোনো মামলা দায়ের করা হয়নি। তবে পরিবারের পক্ষ থেকে নিয়মিত মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
মন্তব্য