খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৩ই জুলাই ২০২৬, ৩:১২ পিএম

বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরের দেয়ালে রহস্যময় উপস্থিতির মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার জন্ম দেওয়া ‘সুবোধ’ এবার দেখা দিল ভারতের সিকিমে। ‘হবেকি?’ ট্যাগযুক্ত এই নতুন গ্রাফিতি শুধু শিল্পপ্রেমীদেরই নয়, সীমান্ত রাজনীতি, প্রতীকী শিল্পচর্চা এবং জনপরিসরের শিল্প নিয়ে আগ্রহীদের মধ্যেও নতুন করে কৌতূহল সৃষ্টি করেছে।
জুন মাসের শেষ দিনে সিকিমের গ্যাংটক-রংপো সড়কের মাঝিতার নালা ব্রিজের একটি কংক্রিটের দেয়ালে আঁকা হয় প্রায় ২০ ফুট দীর্ঘ এই গ্রাফিতি। স্প্রে পেইন্ট ও স্টেনসিল প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি চিত্রকর্মটির শেষ প্রান্তে আগের মতোই রয়েছে শিল্পীর স্বাক্ষরধর্মী ট্যাগ—‘হবেকি?’।
গ্রাফিতিতে দেখা যায়, এলোমেলো লম্বা চুলের সুবোধ জুতা পরা অবস্থায় একটি ঝুলন্ত হ্যামকে শুয়ে আছেন। হ্যামকটির দুই প্রান্ত কাঁটাতারের সঙ্গে বাঁধা। তাঁর ডান হাতে রয়েছে কাটাতার কাটার একটি যন্ত্র, আর অন্য হাতটি হ্যামকের বাইরে ঝুলে আছে। নিচে রাখা একটি বালতি পুরো দৃশ্যটিকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে। শিল্পকর্মটির প্রতিটি উপাদান যেন কোনো প্রতীকী ভাষায় একটি অপ্রকাশিত বার্তা বহন করছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকদিন ধরেই মাঝিতার নালা ব্রিজ এলাকায় এই গ্রাফিতি দেখা যাচ্ছে। তবে কে বা কারা এটি এঁকেছেন, সে বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
এই শিল্পকর্মটি এমন এক সময়ে প্রকাশ্যে আসে, যখন অনুপ্রবেশের অভিযোগে ভারত থেকে কথিত বাংলাদেশিদের জোরপূর্বক ফেরত পাঠানোকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সীমান্ত পরিস্থিতি আলোচনায় রয়েছে। একই সময়ে সীমান্ত নিরাপত্তা, কাঁটাতারের বেড়া এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে নানা বিতর্কও চলমান। এর মাত্র দুই দিন আগে প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য পর্যটক ভিসা চালুর ঘোষণা দেয় ভারত। ফলে সময় নির্বাচন এবং গ্রাফিতির প্রতীকী উপস্থাপনাকে ঘিরে নানা ব্যাখ্যা সামনে আসছে।
‘হবেকি?’ সিরিজের শিল্পকর্মের নথিভুক্তির কাজ করে আর্টকন নামের একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা এআরকে রিপন জানিয়েছেন, সিকিমে আঁকা এই গ্রাফিতির ভাবনা ও স্থান নির্বাচনের সঙ্গে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, সীমান্তের কাঁটাতার, কাটাতার কাটার যন্ত্র এবং তিস্তা নদীর পানিবণ্টনসহ একাধিক প্রতীকী বিষয় জড়িয়ে আছে।
তিনি বলেন, রংপো শহর সিকিমের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত। গ্যাংটকের পথে এই এলাকায় প্রবেশ, পরিচয় যাচাই, প্রয়োজনীয় নথিপত্র এবং অনুমতির বিষয়গুলো মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার অংশ। সেই বাস্তবতার মধ্যে এই গ্রাফিতি কেবল একটি দেয়ালচিত্র নয়; বরং সীমান্ত, চলাচল, নিয়ন্ত্রণ ও স্বাধীনতার প্রশ্নকে নতুনভাবে সামনে নিয়ে আসা একটি শিল্পভাষ্য।
বাংলাদেশে গত প্রায় এক দশক ধরে ‘সুবোধ’ সিরিজের গ্রাফিতি বিভিন্ন সময় সামাজিক, রাজনৈতিক ও মানবিক নানা প্রসঙ্গকে ইঙ্গিতপূর্ণভাবে তুলে ধরেছে। কোথাও প্রতিবাদের ভাষা, কোথাও ব্যঙ্গ, আবার কোথাও নীরব প্রশ্নের মাধ্যমে এই শিল্পকর্মগুলো জনমনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রতিটি গ্রাফিতিতে স্টেনসিল প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সংক্ষিপ্ত অথচ অর্থবহ বার্তা ‘হবেকি?’ সিরিজকে অন্য সব দেয়ালচিত্র থেকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।
সবচেয়ে বড় রহস্য হলো, আজও এই শিল্পীর প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ্যে আসেনি। কখনও তাঁকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি, আবার কোনো চিত্রকর্মের মালিকানাও কেউ দাবি করেননি। ফলে ‘হবেকি?’ নামটি এখন কেবল একটি স্বাক্ষর নয়, বরং এক রহস্যময় শিল্প-পরিচয়ের প্রতীক।
ধারণা করা হয়, ২০১৭ সালের দিকে ‘সুবোধ’ সিরিজের গ্রাফিতিগুলো ব্যাপকভাবে মানুষের নজরে আসে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। সে সময় শিল্পীর পরিচয় উদ্ঘাটনের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাও অনুসন্ধান চালিয়েছিল বলে বিভিন্ন সময়ে জানা যায়। তবে এত বছর পরও তাঁর পরিচয় অজানাই রয়ে গেছে।
সিকিমে আঁকা সর্বশেষ এই গ্রাফিতি সেই দীর্ঘ রহস্যের নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। সীমান্তের কাঁটাতার, মানুষের চলাচল, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাধীনতার প্রতীকী উপস্থাপনার মাধ্যমে এটি শিল্পপ্রেমী থেকে শুরু করে রাজনৈতিক বিশ্লেষক—সব মহলের মধ্যেই নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
মন্তব্য