খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৪ই জুলাই ২০২৬, ৪:৫০ পিএম

ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির আনুষ্ঠানিক জানাজা শনিবার রাজধানী তেহরানে শুরু হয়েছে। জাতীয় শোকের আবহে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে ইরানের জাতীয় পতাকায় মোড়ানো খামেনির কফিন আনা হলে সেখানে উপস্থিত হাজারো মানুষ আবেগঘন পরিবেশে শেষ শ্রদ্ধা জানান। কফিনের ওপর রাখা ছিল তার পরিচিত কালো পাগড়ি, যা দীর্ঘদিন ধরে তার নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে পরিচিত ছিল।
তবে পুরো অনুষ্ঠানের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য ছিল খামেনির কফিনের পাশেই রাখা একটি ছোট্ট শিশুর কফিন। সেটি ছিল তার মাত্র ১৪ মাস বয়সী নাতনি জাহরা মোহাম্মাদী গোলপায়গানির। ছোট্ট কফিনটি উপস্থিত মানুষের দৃষ্টি কাড়ে এবং শোকের আবহকে আরও ভারী করে তোলে।
খামেনির কফিনের পাশে মোট চারটি অতিরিক্ত কফিন রাখা হয়। এর মধ্যে ছিল তার মেয়ের জামাই মেসবাহ উল হুদা বাঘেরি, তার জ্যেষ্ঠ কন্যা সৈয়দা বুশরা হোসেইনি খামেনি এবং তার পুত্র ও বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির স্ত্রী জাহরা হাদ্দাদ আদেলের মরদেহ। সব কফিনই ইরানের জাতীয় পতাকায় মোড়ানো ছিল।
সংবাদে বলা হয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় আলী খামেনি এবং তার পরিবারের কয়েকজন সদস্য নিহত হন। এরপর থেকেই ইরানজুড়ে রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হচ্ছে। নিহত নেতার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ রাজধানী তেহরানে সমবেত হচ্ছেন।
ছয় দিনব্যাপী দাফন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে শুক্রবার খামেনির মরদেহ তেহরানে আনা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, দাফনের আগে মরদেহ ইরানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরের পাশাপাশি প্রতিবেশী ইরাকের কয়েকটি পবিত্র শহরেও নেওয়া হবে, যাতে সাধারণ মানুষ শেষ শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ পান।
শনিবার সকালে রাজধানীর গ্র্যান্ড মোসাল্লা জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়ার আগেই শুক্রবার রাত থেকে শত শত সমর্থক সেখানে অবস্থান নেন। ফটক খোলার সঙ্গে সঙ্গে হাজার হাজার মানুষ ভেতরে প্রবেশ করেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই বিশাল প্রাঙ্গণ শোকাহত মানুষের উপস্থিতিতে পূর্ণ হয়ে যায়। কর্তৃপক্ষের ধারণা, আগামী তিন দিনে শুধু তেহরানেই ১ কোটি ৫০ লাখ থেকে ২ কোটি মানুষের অংশগ্রহণ হতে পারে।
এএফপি জানিয়েছে, জানাজায় অংশ নেওয়া অনেক শোকাহত ব্যক্তি লাল ব্যানার বহন করছিলেন, যা প্রতিশোধের দাবির প্রতীক হিসেবে পরিচিত। এ সময় সমবেত জনতার একটি অংশ ‘আমেরিকার মৃত্যু হোক’ এবং ‘প্রতিশোধ, প্রতিশোধ’ স্লোগান দেয়।
জানাজায় অংশ নেওয়া ২৭ বছর বয়সী এক ব্যক্তি বলেন, তিনি তার প্রিয় নেতা আলী খামেনিকে শেষ বিদায় জানাতে এসেছেন। এমন একটি দিন দেখতে হবে, তা কখনো কল্পনাও করেননি। তার ভাষায়, এই মর্মান্তিক ঘটনার আগে যদি তিনি মারা যেতেন, তবে এমন শোকের সাক্ষী হতে হতো না।
শুক্রবার দেশটির শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকর্তারাও প্রয়াত নেতার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ সময় ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় অন্যতম প্রধান প্রতিনিধি মোহাম্মদ বাগের গালিবাফকে আবেগাপ্লুত অবস্থায় দেখা যায়।
জানাজা অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর নবনিযুক্ত প্রধান আহমদ ওয়াহিদি। একই হামলায় তার পূর্বসূরি নিহত হওয়ার পর তিনি এ দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে ভারতের প্রতিনিধিদলের পক্ষ থেকেও সৈয়দ আতা হাসনাইন এবং পবিত্র মার্গারিটা অংশ নেন।
দাফনসূচি অনুযায়ী, আলী খামেনির মরদেহ সোমবার পর্যন্ত তেহরানে রাখা হবে। ওই দিন রাজধানীজুড়ে একটি বৃহৎ শোকযাত্রার আয়োজন করা হবে। এরপর মঙ্গলবার মরদেহ নেওয়া হবে ধর্মীয় নগরী কোমে। বুধবার তা ইরাকের কয়েকটি পবিত্র শহরে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সবশেষে বৃহস্পতিবার উত্তর-পূর্ব ইরানের নিজ শহর মাশহাদে তাকে দাফন করা হবে।
খামেনির জানাজা শুধু একজন রাষ্ট্রনেতার বিদায়ের অনুষ্ঠান নয়, বরং তার পরিবারের একাধিক সদস্যের একসঙ্গে মৃত্যুর কারণে এটি ইরানের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম শোকাবহ রাষ্ট্রীয় আয়োজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে ১৪ মাস বয়সী জাহরা মোহাম্মাদী গোলপায়গানির ছোট্ট কফিনের উপস্থিতি পুরো অনুষ্ঠানে গভীর মানবিক বেদনার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
মন্তব্য