সিলেট বিভাগে হাম ও নিউমোনিয়ার প্রাদুর্ভাব জনস্বাস্থ্য খাতে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। চলতি বছরের শুরু থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত হামের উপসর্গ ও নিউমোনিয়াজনিত জটিলতায় ৬৯ শিশু এবং একজন নার্সের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন রোগী শনাক্ত ও হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা বাড়তে থাকায় স্বাস্থ্য বিভাগ পরিস্থিতিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে ৮০ জন রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে পরীক্ষাগারে নমুনা বিশ্লেষণের মাধ্যমে আরও চারজনের শরীরে হাম ভাইরাসের সংক্রমণ নিশ্চিত করা হয়েছে। বর্তমানে বিভাগের সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে মোট ২৯৭ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মাহবুবুল আলম জানিয়েছেন, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত বিভাগজুড়ে মোট ৩২২ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী পাওয়া গেছে সুনামগঞ্জ জেলায়। এছাড়া সিলেট, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলাতেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সংক্রমণ ধরা পড়েছে। হবিগঞ্জে শনাক্ত রোগীদের মধ্যে দুইজনের শরীরে রুবেলা সংক্রমণও পাওয়া গেছে, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের নজরে এসেছে।
জেলাভিত্তিক হাম শনাক্তের চিত্র
| জেলা | শনাক্ত রোগী |
|---|---|
| সুনামগঞ্জ | ১৭৭ |
| সিলেট | ১০৫ |
| হবিগঞ্জ | ২৪ |
| মৌলভীবাজার | ১৬ |
| মোট | ৩২২ |
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত একদিনে ভর্তি হওয়া ৮০ জন রোগীর মধ্যে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৯ জন এবং শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ২৭ জন ভর্তি হয়েছেন। এছাড়া সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে ১৭ জন, মৌলভীবাজার জেলা সদর হাসপাতালে পাঁচজন, উইমেন্স মেডিকেল হাসপাতালে একজন এবং কানাইঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একজন রোগী ভর্তি হয়েছেন। অন্যান্য হাসপাতালেও কয়েকজন নতুন রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন।
বর্তমানে চিকিৎসাধীন রোগীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী রয়েছেন সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। বিভাগজুড়ে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীদের জন্য পৃথক চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগী
| হাসপাতালের নাম | রোগীর সংখ্যা |
|---|---|
| সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল | ৯৪ |
| সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতাল | ৫০ |
| শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতাল | ১৮ |
| মৌলভীবাজার জেলা সদর হাসপাতাল | ১৩ |
| হবিগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতাল | ১২ |
| রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল | ১০ |
| নর্থ ইস্ট মেডিকেল হাসপাতাল | ৮ |
| পার্কভিউ মেডিকেল হাসপাতাল | ৪ |
| ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স | ৪ |
| মাউন্ট এডোরা হাসপাতাল | ২ |
| উইমেন্স মেডিকেল হাসপাতাল | ১ |
| কানাইঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স | ১ |
| অন্যান্য হাসপাতাল | ৮০ |
| মোট | ২৯৭ |
যদিও গত ২৪ ঘণ্টায় হাম-সন্দেহজনক কোনো নতুন মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি, তবে চলতি বছরে মৃত্যুর সংখ্যা ৭০-এ পৌঁছানো স্বাস্থ্য বিভাগের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। শিশুদের ক্ষেত্রে এ রোগ থেকে নিউমোনিয়া, অপুষ্টি, কানের সংক্রমণ, ডায়রিয়া এবং অন্যান্য জটিলতা দেখা দিতে পারে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম প্রতিরোধে নিয়মিত টিকাদানই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির আওতায় নির্ধারিত বয়সে শিশুদের টিকা গ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে সংক্রমণ ও মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। বিশেষ করে যেসব এলাকায় সংক্রমণের হার বেশি, সেখানে টিকাদান কার্যক্রমের পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা সুবিধা আরও শক্তিশালী করা হয়েছে। একই সঙ্গে রোগ শনাক্তকরণ, নমুনা পরীক্ষা, নজরদারি এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। অভিভাবকদের শিশুদের নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করার পাশাপাশি জ্বর, র্যাশ বা হাম-সদৃশ উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, সমন্বিত প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ ও দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।
