জি- লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ৫ই আগস্ট ২০২৬, ৯:৪০ পিএম

ফেনীতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শহীদদের পরিবার এবং আহত জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে পুলিশের পেশাগত দায়বদ্ধতা, সীমাবদ্ধতা ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এক অতীব আবেগঘন ও তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন জেলা পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদার। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “আমাদের চাকরির ধরনটাই আসলে এমন যে, আমরা যত কিছুই করার চেষ্টা করি না কেন, শেষ পর্যন্ত হয়তো কারোরই মন জয় করতে পারি না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই নিরন্তর চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতি দেখে মাঝে মাঝে মনে হয়, ‘জন্মই যেন আমাদের আজন্ম পাপ’।”
গত বুধবার দুপুরে ফেনী জেলা প্রশাসনের সার্বিক পরিচালনায় জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে ‘জুলাই শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা’ শীর্ষক বিশেষ আলোচনা সভাটির আয়োজন করা হয়। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে উপস্থিত শহীদ পরিবারের স্বজনেরা এবং আন্দোলনে আহত ব্যক্তিরা অভ্যুত্থান চলাকালীন ও পরবর্তী দিনগুলোতে জেলা পুলিশের ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ, বেদনা ও বিভিন্ন সমালোচনা তুলে ধরেন। তাদের সেই অভিযোগ ও আবেগঘন বক্তব্যের পরপরই ফেনীর পুলিশ প্রধান মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজস্ব অবস্থান, চলমান আইনি প্রক্রিয়া এবং পুলিশের কাজের নানান চ্যালেঞ্জি ও সীমাবদ্ধতার প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন।
নিজের দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে প্রত্যুষ কুমার মজুমদার প্রকাশ করেন যে, তিনি ফেনীতে নতুন পুলিশ প্রধান হিসেবে যোগ দিয়েছেন মাত্র দেড় মাস আগে। তার এই সংক্ষিপ্ত মেয়াদের আগে আরও দুজন কর্মকর্তা পুলিশ সুপার হিসেবে ফেনী জেলায় দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি জানান, বৈষম্যবিরোধী গণঅভ্যুত্থান চলাকালীন বিভিন্ন সহিংসতার ঘটনায় ফেনী জেলার বিভিন্ন থানায় এ পর্যন্ত মোট ২২টি মামলা নথিবদ্ধ হয়েছে। পুলিশ প্রশাসন অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে প্রতিটি ঘটনার তদন্ত পরিচালনা করছে এবং ইতিমধ্যে ২২টি মামলার মধ্যে ১৪টি মামলার পূর্ণাঙ্গ অভিযোগপত্র (চার্জশিট) বিজ্ঞ আদালতে দাখিল করতে সক্ষম হয়েছে।
আইনগত পদক্ষেপের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করে পুলিশ সুপার আরও যোগ করেন, নথিবদ্ধ হওয়া মামলাগুলোর ভিত্তিতে এ পর্যন্ত ১ হাজার ২০০ জনেরও বেশি আসামিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় এনেছে। তবে বিচারিক ব্যবস্থার নিজস্ব আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ইতিমধ্যে প্রায় ৮৬০ জন আসামি আদালত থেকে জামিন পেয়ে মুক্ত হয়ে গেছেন। জামিন মঞ্জুর বা প্রত্যাখ্যান সম্পূর্ণভাবে বিচার বিভাগের একতচ্ছ অধিকার ও এখতিয়ার হওয়ায় এখানে তদন্তকারী সংস্থার যে নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা থাকে, সে কথাটি তিনি পরোক্ষভাবে উপস্থিত সবার সামনে স্পষ্ট করেন।
উল্লেখ্য, সংবর্ধনা সভার আগেই সকালে শহরের মুক্তবাজার এলাকায় নির্মিত ‘জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে’ পুস্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে দিনব্যাপী আয়োজনের সূচনা হয়। প্রারম্ভে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্মৃতিস্তম্ভের বেদিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন ফেনীর জেলা প্রশাসক মনিরা হক। একে একে জেলা পুলিশ প্রশাসন, জেলা পরিষদ, স্থানীয় সরকার বিভাগ ও সিভিল সার্জন কার্যালয়ের প্রতিনিধিরা শ্রদ্ধা জানান। পরে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মীসহ সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শহীদদের মহান আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন।
স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা জানানো শেষে দুপুরে মূল সংবর্ধনা পর্বের সুচনা ঘটে। সভায় জুলাই অভ্যুত্থানে প্রাণ হারানো শহীদদের শোকসন্তপ্ত স্বজন এবং আহত বীর যোদ্ধাদের হাতে বিশেষ সম্মাননা ও উপহার তুলে দেয় জেলা প্রশাসন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিশিষ্ট বক্তারা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ঐতিহাসিক তাৎপর্য তুলে ধরেন। তারা শহীদদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত নতুন বাংলাদেশ গঠনে ঐক্যবদ্ধ থাকার অঙ্গীকার জানান এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলো যেন কোনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ছাড়াই দ্রুত বিচার পায়, তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনকে উদাত্ত আহ্বান জানান।
মন্তব্য