বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনের সাথে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারী প্রতিনিধিদের কম উপস্থিতির সুনির্দিষ্ট কারণ ও প্রেক্ষাপট জানতে চেয়েছে জাতিসংঘের নারী বিষয়ক সংস্থা ‘ইউএন ওমেন’। এর জবাবে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, দেশের প্রচলিত আইনি কাঠামো অনুযায়ী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী নারী প্রার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য থাকলেও চূড়ান্ত পর্যায়ে সরাসরি ভোটে জয়ী হয়েই তাঁদের সংসদে আসতে হয়। আজ রবিবার (১৭ মে, ২০২৬) নির্বাচন ভবনে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।
নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যা ও জেন্ডার ব্যবধান হ্রাস
বৈঠক শেষে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সচিব আখতার আহমেদ সাংবাদিকদের কাছে আলোচনার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি জানান, জাতিসংঘের প্রতিনিধি দলটি মূলত নির্বাচন-পরবর্তী সার্বিক পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। বিশেষ করে জাতীয় সংসদে নারী প্রতিনিধিদের হার আশানুরূপ না হওয়ার কারণ এবং ভবিষ্যতে এই হার কীভাবে বৃদ্ধি করা যায়, তা নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে।
কমিশনের পক্ষ থেকে প্রতিনিধি দলকে অবহিত করা হয় যে, এবারের সংসদে সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত ৭ জন নারী সদস্য রয়েছেন। তবে নির্বাচনে অংশ নেওয়া নারী প্রার্থীর সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি ছিল। এছাড়া সামগ্রিক ভোটার তালিকায় জেন্ডার বা লিঙ্গভিত্তিক ব্যবধান কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে বর্তমান কমিশনের সফলতার চিত্র তুলে ধরা হয়। পূর্বে যেখানে নারী ও পুরুষ ভোটারের মধ্যকার ব্যবধান ছিল প্রায় ৩০ লাখ (তিন মিলিয়ন), বর্তমান কমিশনের বিশেষ উদ্যোগের ফলে তা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়ে ১৮ লাখে (১.৮ মিলিয়ন) নেমে এসেছে। এই ব্যবধান আরও কমিয়ে আনতে কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। একই সাথে এবারের সাধারণ নির্বাচন সম্পূর্ণ সহিংসতাহীন ছিল এবং কোনো ভোট বাক্স ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেনি বলেও জাতিসংঘকে নিশ্চিত করা হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ ও ভোটার তালিকার লিঙ্গভিত্তিক পরিসংখ্যান
বৈঠকে উপস্থাপিত জাতীয় সংসদের নারী সদস্যের বিন্যাস এবং ভোটার তালিকার বর্তমান তুলনামূলক চিত্র নিচে সারণির মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| ক্রমিক সংখ্যা | বিষয়ের বিবরণ | বর্তমান পরিসংখ্যান ও তথ্য |
| ১ | সরাসরি ভোটে নির্বাচিত নারী সংসদ সদস্যের সংখ্যা | ৭ জন |
| ২ | জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের সংখ্যা | ৫০টি |
| ৩ | সংসদে বর্তমান সর্বমোট নারী সদস্যের সংখ্যা | ৫৭ জন (সংরক্ষিত আসনসহ) |
| ৪ | পূর্ববর্তী ভোটার তালিকায় নারী-পুরুষের ব্যবধান | ৩০ লাখ (তিন মিলিয়ন) |
| ৫ | বর্তমান ভোটার তালিকায় নারী-পুরুষের ব্যবধান | ১৮ লাখ (১.৮ মিলিয়ন) |
স্থানীয় সরকারের সম্ভাবনা ও জাতিসংঘের প্রতিনিধি দল
নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ আরও উল্লেখ করেন যে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তুলনায় আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে নারী প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ এবং সংখ্যাগত উপস্থিতি আরও অনেক বৃদ্ধি পাবে বলে কমিশন দৃঢ়ভাবে আশাবাদী। জাতিসংঘের পক্ষ থেকে নতুন কোনো সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দেওয়া হয়েছে কিনা—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে সচিব জানান, তারা মূলত নির্বাচন কমিশনের সাথে চলমান প্রাতিষ্ঠানিক যৌথ কর্মসূচিসমূহ ভবিষ্যতেও অব্যাহত রাখার ব্যাপারে পূর্ণ প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন।
এর আগে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কার্যালয়ে এই বিশেষ দ্বিপাক্ষিক বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে জাতিসংঘের নারী বিষয়ক সংস্থার পক্ষ থেকে পাঁচ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল অংশগ্রহণ করে। এই প্রতিনিধি দলে উপস্থিত ছিলেন সংস্থার সহকারী মহাসচিব এবং উপ-নির্বাহী পরিচালক মিস ন্যারাদজাই গুম্বনজভান্দা, আঞ্চলিক পরিচালক ক্রিস্টিন আরব, প্রতিনিধি মিস গীতাঞ্জলি সিং, উপ-প্রতিনিধি নবনীতা সিনহা এবং ইউনিট ব্যবস্থাপক তপাটি সাহা। বাংলাদেশের পক্ষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং কমিশনের অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবর্গ উপস্থিত থেকে রাষ্ট্রীয় আইনি অবস্থান ও নির্বাচনী তথ্যসমূহ উপস্থাপন করেন।
