কেরানীগঞ্জের কোন্ডা ইউনিয়নের দোলেশ্বর এলাকায় জমি দখল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কব্জা ও চাঁদাবাজির অভিযোগকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক কাটছে না। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি বলে দাবি করেছেন এলাকাবাসী। তাদের অভিযোগ, স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী কয়েকজন ব্যক্তি রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখানো, জমি দখল এবং বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দোলেশ্বর ও আশপাশের এলাকায় এসব কর্মকাণ্ডের অভিযোগ সামনে আসে। তাদের দাবি, যুবদল নেতা হিসেবে পরিচিত সাইমন ও তানভীর, বাপ্পি এবং বিএনপি নেতা হিসেবে পরিচিত রুমানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে জমি দখল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দখল, চাঁদাবাজি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, দোলেশ্বর গ্রামের নিয়ামত উল্লাহর ছেলে সাইমনের বিরুদ্ধে মামলা বাণিজ্য, ভয়ভীতি প্রদর্শন, জমি দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা দাবি করেন, এলাকায় প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক পরিচয় ব্যবহার করেন। কখনো নিজেকে যুবদল নেতা, কখনো বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি, আবার কখনো সমন্বয়ক হিসেবে পরিচয় দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের আরও দাবি, প্রশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও তারা শুনেছেন।
দোলেশ্বর পশ্চিম পাড়ার বাসিন্দা তানভীরের বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিকেলের পর কোন্ডা ইউনিয়নের ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে লুটপাট ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনায় তিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, পরবর্তী সময়েও তার প্রভাব ও তৎপরতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
অন্যদিকে, দোলেশ্বর মধ্যপাড়ার বাসিন্দা মৃত কাদের মিয়ার ছেলে রুমান দীর্ঘ সময় বিদেশে থাকার পর ৫ আগস্টের পর দেশে ফিরে এলাকায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এরপর থেকে জমি দখল, চাঁদাবাজি এবং সাধারণ মানুষকে বিভিন্নভাবে হয়রানির সঙ্গে তার নাম জড়িয়েছে। এসব অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়দের সবচেয়ে বেশি আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো বুড়িগঙ্গা নদীর তীরবর্তী এলাকায় একটি মার্কেট দখলের ঘটনা। অভিযোগ অনুযায়ী, খায়রুজ্জামান রাজা মিয়ার মালিকানাধীন একটি মার্কেট কয়েক মাস আগে জোরপূর্বক দখলের চেষ্টা করা হয়। পরে সেখানে একটি সাইনবোর্ড টাঙানো হয় এবং মার্কেটটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি করা হয় বলে স্থানীয়রা জানান।
ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার কথাও জানিয়েছেন স্থানীয় সূত্রগুলো। ভিডিওতে সাইনবোর্ড স্থাপনের পর কয়েকজনকে ধর্মীয় স্লোগান দিতে দেখা যায় বলে দাবি করা হয়েছে। সাইনবোর্ডে শেখ রন্নু মাঝি ও রন্নু ব্যাপারীর ওয়ারিশদের উদ্যোগে দখল বুঝে নেওয়ার কথা উল্লেখ ছিল বলে স্থানীয়দের ভাষ্য। এই দখল কার্যক্রমের সঙ্গে সাইমন, তানভীর, বাপ্পি ও রুমানের নাম জড়ানো হলেও অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাদের প্রত্যেকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এলাকাবাসীর অভিযোগের তালিকায় আরও রয়েছে দোলেশ্বর কসাইবাড়ি এলাকার বাসিন্দা দীপুর নাম। স্থানীয় শ্রমিক দলের সভাপতি হিসেবে পরিচিত এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে জমি দখল, মাদক ব্যবসা এবং বসুন্ধরা এলাকায় ময়লা ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন। তাদের দাবি, এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে একটি প্রভাবশালী চক্র এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের কর্তৃত্ব বজায় রাখছে। তবে এসব অভিযোগেরও স্বাধীন তদন্ত বা নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এই প্রতিবেদনে উপস্থাপিত হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, অভিযোগগুলো নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ না থাকায় তাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে জমি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে বিরোধে সাধারণ মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন। কেউ কেউ অভিযোগ প্রকাশ্যে বলতে ভয় পাচ্ছেন বলেও দাবি করেছেন।
এ অবস্থায় দোলেশ্বরের বাসিন্দারা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই, ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন, জমি দখল, চাঁদাবাজি, লুটপাট বা ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো অভিযোগের ক্ষেত্রে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। এতে প্রকৃত অপরাধীরা চিহ্নিত হওয়ার পাশাপাশি নির্দোষ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও ওঠা অভিযোগের অবসান ঘটবে বলে মনে করছেন তারা।









