শরিয়াহ ভিত্তিক ব্যাংকগুলোর আমানত ও সম্পদে সুষম প্রবৃদ্ধি

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ মাসে দেশের শরিয়াহ ভিত্তিক ইসলামী ব্যাংকগুলোর আমানত, মোট সম্পদসহ প্রধান প্রধান আর্থিক সূচকে একটি সুষম ও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি পরিলক্ষিত হয়েছে। বিগত সময়ের কিছু সাময়িক জটিলতা কাটিয়ে এই ব্যাংকিং খাতটি পর্যায়ক্রমে স্থিতিশীলতার দিকে অগ্রসর হচ্ছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে উঠে এসেছে। তবে একই সময়ে সাধারণ বা প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোতে আমানত জমার গতি ছিল আরও বেশি উর্ধমুখী, যা সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থায় গ্রাহকদের আমানত রাখার প্রবণতার একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে।

আমানত সংগ্রহ ও বিনিয়োগের বার্ষিক পরিসংখ্যান

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে ইসলামী ব্যাংকগুলোতে জমা থাকা মোট আমানতের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৭৯ হাজার কোটি টাকা, যা পূর্ববর্তী মাস অর্থাৎ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৪ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা। বার্ষিক তুলনামূলক বিচারে, ২০২৫ সালের মার্চের ৪ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকার চেয়ে এই আমানতের পরিমাণ ৯ দশমিক ২২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে, প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোর মোট আমানত এক বছরের ব্যবধানে ১৫ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা থেকে ১২ দশমিক ৭২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৬ সালের মার্চে ১৭ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে।

বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ২০২৬ সালের মার্চ মাসে ইসলামী ব্যাংকগুলো এক ধরনের স্থিতিশীলতা বজায় রেখেছে। এই মাসে তাদের মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৯১ হাজার কোটি টাকা, যা পূর্ববর্তী ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৫ লাখ Bound৮ হাজার কোটি টাকা। ২০২৫ সালের মার্চের ৫ লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকার তুলনায় এই খাতের বার্ষিক বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৮৫ শতাংশ রেকর্ড করা হয়েছে।

নিছে শরিয়াহ ভিত্তিক ব্যাংকগুলোর প্রধান আর্থিক কাঠামোর একটি চিত্র ছকের সাহায্যে তুলে ধরা হলো:

আর্থিক খাতের সূচকসমূহ২০২৬ সালের মার্চ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি২০২৫ সালের মার্চবার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার
খাতভিত্তিক মোট সম্পদ৯ লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকা৯ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা৮ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা৫.৯৫% বৃদ্ধি
গ্রাহকদের মোট আমানত৪ লাখ ৭৯ হাজার কোটি টাকা৪ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা৪ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকা৯.২২% বৃদ্ধি
বিতরণকৃত মোট বিনিয়োগ৫ লাখ ৯১ হাজার কোটি টাকা৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা৫ লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকা৬.৮৫% বৃদ্ধি
এজেন্ট ব্যাংকিং আমানত২৭২ আরব টাকা২৬৯ আরব টাকা২২১ আরব টাকা২২.৯৬% বৃদ্ধি

আমানতের অভ্যন্তরীণ উৎস ও বিনিয়োগের খাতভিত্তিক বিভাজন

দেশের ইসলামী ব্যাংকগুলোর সংগৃহীত আমানতের একটি বড় অংশই আসে মুদারাবা ভিত্তিক হিসাবসমূহ থেকে, যা মোট আমানতের প্রায় ৮৬ দশমিক ৬১ শতাংশ। এই বিশাল আমানত ভিত্তির মধ্যে প্রায় ৯০ দশমিক ৪৮ শতাংশ অর্থ জোগান দিয়েছে দেশের বেসরকারি খাত। অন্যদিকে, ঋণ বা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এই ব্যাংকগুলো মূলত নির্দিষ্ট কিছু কাঠামোগত পদ্ধতির ওপর বেশি নির্ভর করছে। এর মধ্যে বাই-মুরাবাহা পদ্ধতিতে সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ৪৪ দশমিক ২০ শতাংশ বিনিয়োগ করা হয়েছে। এরপর দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে থাকা এইচপিএসএম পদ্ধতিতে ১৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ এবং বাই-মুয়াজ্জল পদ্ধতিতে ১৭ দশমিক ২৬ শতাংশ বিনিয়োগ করা হয়েছে। এই খাতের সিংহভাগ বিনিয়োগ মূলত দেশের বৃহৎ শিল্প এবং ব্যবসা-বাণিজ্য খাতেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

বৈদেশিক বাণিজ্য ও উপশাখা ব্যাংকিংয়ের চিত্র

২০২৬ সালের মার্চ মাসে ইসলামী ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক বাণিজ্য সংক্রান্ত সূচকগুলোতে একটি মিশ্র প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। আলোচ্য মাসে এই ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে মোট রপ্তানি আয় দেশে এসেছে ৬১ কোটি ৭ লাখ মার্কিন ডলার, যা ফেব্রুয়ারির ৬০ কোটি ৪ লাখ মার্কিন ডলারের তুলনায় ২ দশমিক ১১ শতাংশ বেশি হলেও গত বছরের মার্চের ৭৪ কোটি ২ লাখ মার্কিন ডলারের চেয়ে ১৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ কম। আমদানি ব্যয়ের ক্ষেত্রে মার্চ মাসে মোট পরিশোধ করা হয়েছে ৮৭ কোটি মার্কিন ডলার, যা আগের মাসের চেয়ে ২ দশমিক ১৬ শতাংশ বাড়লেও ২০২৫ সালের মার্চের তুলনায় ২৫ দশমিক ২৮ শতাংশ কম। তবে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক গতি দেখা গেছে; এটি ফেব্রুয়ারির ৬৬ কোটি ১ লাখ মার্কিন ডলার থেকে ৬ দশমিক ০২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে মার্চে ৭০ কোটি ১ লাখ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে, যদিও তা গত বছরের মার্চের তুলনায় ৩ দশমিক ০৯ শতাংশ কম।

এজেন্ট বা উপশাখা ব্যাংকিং কার্যক্রমে ইসলামী ব্যাংকগুলোর অংশীদারিত্ব বেশ আশাব্যঞ্জক। ২০২৬ সালের মার্চে এই খাতে আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৭২ আরব টাকা, যা দেশের সামগ্রিক এজেন্ট ব্যাংকিং আমানতের ৫৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এই খাতে নিয়োজিত বিশেষায়িত কর্মীর সংখ্যা ২০২৬ সালের মার্চে দাঁড়িয়েছে ৫৮০ জনে, যা আগের মাসে ছিল ৫৮২ জন।

বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন ও নীতিগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ এই সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে জানিয়েছেন যে, একটি প্রতিকূল সময় পার করার পর দেশের শরিয়াহ ভিত্তিক ব্যাংকগুলো বর্তমানে ঘুরে দাঁড়ানোর স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। আমানত বৃদ্ধি, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের বিস্তার এবং শরিয়াহ সম্মত অর্থায়নের ধারাবাহিক চাহিদা এই খাতের অন্তর্নিহিত শক্তিকে প্রমাণ করে। তবে সামষ্টিক অর্থনীতির বিদ্যমান অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগ ও বৈদেশিক বাণিজ্যের ধীর গতি এটিও নির্দেশ করে যে, ব্যাংকগুলো এখন অত্যন্ত সতর্কতার সাথে তাদের পদক্ষেপ ফেলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই খাতের বর্তমান প্রবৃদ্ধিকে টেকসই করতে এবং সাধারণ ব্যাংকগুলোর সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং নিয়মনীতি পরিচালনাকারী সংস্থার কঠোর তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি।