খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ই জুন ২০২৬, ৩:৩৩ পিএম

‘চরমপত্র’-এর অবিনাশী কণ্ঠস্বর
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা হাতে অস্ত্র না ধরেও শব্দকে অস্ত্রে পরিণত করে একটি জাতিকে বিজয়ের পথে এগিয়ে নিয়েছিলেন। তাঁদের অগ্রগণ্য একজন এম আর আখতার মুকুল। তিনি ছিলেন একাধারে সাংবাদিক, লেখক, সম্পাদক, বুদ্ধিজীবী এবং স্বাধীনতার অগ্নিঝরা দিনগুলোর এক অনন্য শব্দযোদ্ধা।
তাঁর অমর সৃষ্টি ‘চরমপত্র’ শুধু একটি বেতার অনুষ্ঠান ছিল না; এটি ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস, দেশবাসীর আশা এবং পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে এক দুর্ধর্ষ মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত তাঁর ব্যঙ্গ, রসিকতা, তীক্ষ্ণ ভাষা ও দেশাত্মবোধে ভরপুর কথিকা মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করত, আর শত্রুর মনে সৃষ্টি করত ভীতি ও অনিশ্চয়তা।
এম আর আখতার মুকুল—যাঁর পুরো নাম মুস্তাফা রওশন আখতার মুকুল—১৯২৯ সালের ৯ আগস্ট বগুড়ার ঐতিহাসিক মহাস্থানগড়ের অদূরে চিংগাসপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক সাদত আলি আখন্দ এবং মাতা রাবেয়া খাতুন। দেশবরেণ্য শিক্ষাবিদ মোস্তফা নূর-উল-ইসলাম ছিলেন তাঁর সহোদর।
ছাত্রজীবন থেকেই তিনি প্রগতিশীল রাজনীতিতে সম্পৃক্ত ছিলেন। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে তাঁকে একাধিকবার কারাবরণ করতে হয়। কারাগারে থেকেই ১৯৪৮-৪৯ সালে স্নাতক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং ১৯৫১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
কর্মজীবনের শুরুতে তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করলেও সাংবাদিকতাই ছিল তাঁর প্রকৃত পরিচয়। তিনি দৈনিক আজাদ, দৈনিক ইত্তেফাক, পূর্বদেশসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা ইউনাইটেড প্রেস ইন্টারন্যাশনাল (UPI)-এর ঢাকা ব্যুরো প্রধান হিসেবেও তিনি সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।
মুক্তিযুদ্ধে তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান আসে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ‘চরমপত্র’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ, আঞ্চলিক ভাষার অনবদ্য ব্যবহার এবং শত্রুর বিরুদ্ধে তীক্ষ্ণ কটাক্ষ মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবলকে দৃঢ় করেছিল। যুদ্ধের কঠিন সময়ে তাঁর কল্পনাপ্রসূত অথচ প্রাণবন্ত বর্ণনা মানুষকে বিশ্বাস করতে শিখিয়েছিল—বাংলাদেশের বিজয় অবশ্যম্ভাবী।
তিনি বলতেন—
“বর্ষা আগত, সারাদেশ জলমগ্ন হবে। পাকি’রা সাঁতার জানে না। বিচ্ছুরা শুধু ওদের স্পিডবোট ফুটো করে দেবে, তারপরই কেল্লা ফতে…”
এই ধরনের কথিকা ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের মনে বিজয়ের স্বপ্ন জাগানোর এক অনন্য কৌশল।
স্বাধীনতার পর তিনি ১৯৭২ সালে তথ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং পরে বাংলাদেশ বেতারের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৫ সালে লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনে প্রেস কাউন্সেলর নিযুক্ত হন।
১৯৭৮ সালে সামরিক সরকার তাঁকে দেশে ফিরে উচ্চপদ গ্রহণের প্রস্তাব দিলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার পর সেই রাজনৈতিক বাস্তবতায় আপস করতে তিনি রাজি হননি। নীতির প্রশ্নে অবিচল থেকে তিনি নির্বাসিত জীবন বেছে নেন। পরবর্তীতে ১৯৮৭ সালে দেশে ফিরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র সম্পাদনার দ্বিতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং প্রতিষ্ঠা করেন সাগর পাবলিশার্স, যা বাংলা প্রকাশনা জগতে বিশেষ অবদান রেখে চলেছে।
২০০৪ সালের ২৬ জুন ক্যান্সারের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই শেষে এই কিংবদন্তি শব্দসৈনিক পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। কিন্তু তাঁর কণ্ঠ আজও বেঁচে আছে স্বাধীনতার ইতিহাসে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এবং প্রতিটি দেশপ্রেমিক বাঙালির হৃদয়ে।
১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১, বিজয়ের দিন, ‘চরমপত্র’-এর শেষ সম্প্রচারে তিনি নিজের পরিচয় প্রকাশ করে বলেছিলেন—
«”আইজ ১৬ই ডিসেম্বর। চরমপত্রের শ্যাষের দিন আপনাগো বান্দার নামটা কইয়া যাই। বান্দার নাম এম আর আখতার মুকুল।”»
এই একটি বাক্য যেন ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে আছে। যে কণ্ঠ দীর্ঘ নয় মাস একটি জাতিকে সাহস যুগিয়েছিল, বিজয়ের দিন সেই কণ্ঠই নিজেকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল বিনয়ের সঙ্গে।
শারীরিকভাবে তিনি আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি ‘চরমপত্র’ আজও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক অনন্য দলিল, এক অনিঃশেষ প্রেরণার উৎস।
গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করছি মহান শব্দসৈনিক, সাংবাদিক ও দেশপ্রেমিক এম আর আখতার মুকুলকে।
আপনার কণ্ঠ স্বাধীনতার ইতিহাসে চিরকাল প্রতিধ্বনিত হবে।
আপনার আত্মার শান্তি কামনা করি।
মন্তব্য