খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৯ই জুলাই ২০২৬, ৯:৫৫ পিএম

বরিশালের আগৈলঝাড়ায় এক যুবককে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে থানা হাজতে রাতভর নির্মম নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। এই ঘটনার প্রতিবাদে এবং বিচারের দাবিতে ক্ষুব্ধ স্বজনরা থানা ঘেরাও করলে পুলিশ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে পুলিশ সদস্যসহ উভয় পক্ষের অন্তত ছয়জন গুরুতর আহত হয়েছেন। আজ বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) বিকেলে আগৈলঝাড়া থানা চত্বরে এই তুলকালাম কাণ্ড ঘটে।
নির্যাতনের শিকার যুবকের নাম রিয়াজ ফকির। তিনি আগৈলঝাড়া উপজেলার ফুল্লশ্রী গ্রামের ফকির বাড়ির সিদ্দিক ফকিরের ছেলে। পুলিশ বুধবার রাত ৯টার দিকে তাকে আটক করে থানা হাজতে নিয়ে যায়।
বিকেলে রিয়াজের স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা থানায় জড়ো হয়ে আটকের কারণ এবং নির্যাতনের প্রতিবাদ জানাতে গেলে পরিস্থিতির অবনতি হয়। একপর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে ব্যাপক ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ শুরু হয়। এতে আগৈলঝাড়া থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) ওমর ফারুক, সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) আব্দুল হালিম এবং কনস্টেবল ফরহাদ আহত হন।
অন্যদিকে, প্রতিপক্ষের মধ্যে আহত হয়েছেন রিয়াজ ফকিরের বৃদ্ধা দাদি মমতাজ বেগম, বড় বোন শারমিন এবং চাচা কাঞ্চন ফকির। স্বজনদের অভিযোগ, পুলিশের বেধড়ক লাঠিচার্জে বৃদ্ধা মমতাজ বেগমের হাত ভেঙে গেছে এবং লাঠির আঘাতে চাচা কাঞ্চন ফকির জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।
আগৈলঝাড়া থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) সুশংকর মল্লিক ঘটনার বিবরণ দিয়ে জানান, বিকেলে হঠাৎ করেই ২০ থেকে ২৫ জন নারী-পুরুষ থানার প্রধান ফটকের সামনে এসে হামলা ও ভাঙচুর শুরু করে। পুলিশ তাদের শান্ত করতে এবং বাধা দিতে গেলে তারা উল্টো পুলিশের ওপর চড়াও হয়। এতে তাদের তিন পুলিশ সদস্য জখম হন।
তবে এই দাবি অস্বীকার করেছেন রিয়াজের বোন শারমিন। তিনি জানান, রিয়াজকে কেন ধরে এনে এভাবে পেটানো হলো, তা জানার জন্যই তারা শান্তিপূর্ণভাবে থানায় গিয়েছিলেন। থানার বাইরে দাঁড়িয়ে তারা এই অন্যায়ের বিচার দাবি করতেই পুলিশ কোনো উসকানি ছাড়াই লাঠি উঁচিয়ে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং নারীদেরও পিটিয়ে জখম করে।
রিয়াজের বাবা সিদ্দিক ফকির জানান, বুধবার বিকেলে তার ছেলে বোনের কাছ থেকে মোবাইল ঠিক করার জন্য টাকা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল। এরপর স্থানীয় হেলিপ্যাড এলাকা থেকে আগৈলঝাড়া থানা পুলিশ তাকে গতিরোধ করে। পুলিশ দাবি করে রিয়াজের কাছে মাদক আছে এবং এই অজুহাতে তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়।
সিদ্দিক ফকির বলেন:
“পুলিশের খবর পেয়ে আমি রাতে থানায় গিয়ে ছেলের সঙ্গে দেখা করি। রিয়াজ আমাকে কেঁদে কেঁদে বলে যে তার কাছে কোনো মাদক ছিল না, পুলিশ জোর করে তাকে ধরে এনেছে। আমি পুলিশের সঙ্গে কথা বলে বাড়ি ফিরে আসার পর রাতভর রিয়াজকে নির্মমভাবে পেটানো হয় এবং বৈদ্যুতিক শক দিয়ে নির্যাতন করা হয়।”
তিনি আরও জানান, রাত আড়াইটার দিকে থানার পরিদর্শকসহ (তদন্ত) পাঁচজন পুলিশ সদস্য তাদের বাড়িতে গিয়ে জানান যে রিয়াজ হাজতের শিকের সঙ্গে মাথা ঠুকে অসুস্থ হয়ে পড়েছে, তাকে হাসপাতালে নিতে হবে। সকালে তারা হাসপাতালে গিয়ে রিয়াজকে অজ্ঞান অবস্থায় পান। সিদ্দিক ফকির ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রশ্ন তোলেন, “আমার ছেলে যদি মাথা ঠুকেই অসুস্থ হবে, তবে তার দুই পায়ে মারধরের ও ক্ষতের চিহ্ন আসলো কোথা থেকে? আমরা এই ঘটনার উচ্চপর্যায়ের তদন্ত ও দোষী পুলিশদের শাস্তি চাই।”
নির্যাতনের অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করে পুলিশ পরিদর্শক সুশংকর মল্লিক জানান, রিয়াজ ফকিরের বিরুদ্ধে আগে দুটি মাদক মামলা রয়েছে, যদিও সেগুলোতে সে জামিনে আছে। তবে সম্প্রতি একটি পার্লার থেকে স্বর্ণ চুরির ঘটনায় সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে বুধবার রাত পৌনে ৮টার দিকে ফুল্লশ্রী এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের দাবি, হাজতে ঢোকানোর পরপরই রাত ৯টার দিকে রিয়াজ নিজের মাথায় নিজে আঘাত করতে থাকে এবং শিকের সঙ্গে মাথা ঠুকে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। তাকে কোনো রকম মারধর করা হয়নি। রাতে অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাকে প্রথমে আগৈলঝাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (শেবাচিম) ভর্তি করা হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বর্তমানে পুরো এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
মন্তব্য