খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ই জুলাই ২০২৬, ৪:১ পিএম

শিক্ষার্থীদের ঘোষিত ‘লংমার্চ টু শিক্ষা মন্ত্রণালয়’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বুধবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে। সম্ভাব্য জনসমাগম ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় নীলক্ষেত, সায়েন্সল্যাবসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে অতিরিক্ত পুলিশ ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্য মোতায়েন করা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী উল্লেখযোগ্য কোনো শিক্ষার্থী সমাবেশ না হওয়ায় রাজধানীতে সারাদিন পরিস্থিতি শান্ত, স্বাভাবিক ও নিয়ন্ত্রণে ছিল।
বুধবার (১৫ জুলাই) দুপুরের দিকে নীলক্ষেত মোড়ে এক প্লাটুন বিজিবিকে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। একই সময়ে সায়েন্সল্যাব মোড়ে ৫০ জনের বেশি পুলিশ সদস্য সতর্ক অবস্থানে ছিলেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই প্রস্তুতির উদ্দেশ্য ছিল সম্ভাব্য যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা করা, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা।
এদিন দেশের ৫৯ জেলায় এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ায় প্রশাসনের সতর্কতা আরও বাড়ানো হয়। পরীক্ষার্থীরা যাতে নির্বিঘ্নে পরীক্ষা কেন্দ্রে যাতায়াত করতে পারেন এবং পরীক্ষার সময় কোনো ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি না হয়, সেটিও নিরাপত্তা পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সম্ভাব্য জনসমাগমের কারণে পরীক্ষার্থীদের দুর্ভোগ এড়াতে আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করে।
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা এর আগে ঘোষণা দিয়েছিলেন, পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর রাজধানীর উত্তরার বিএনএস সেন্টারের সামনে, শাহবাগ, সায়েন্সল্যাব ও মগবাজারে সমবেত হয়ে সেখান থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্দেশে ‘লংমার্চ’ কর্মসূচি পালন করবেন। সেই ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বাড়তি নিরাপত্তা জোরদার করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে।
তবে পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর দুপুর ১টার পরও নীলক্ষেত, সায়েন্সল্যাব কিংবা আশপাশের এলাকায় ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী উল্লেখযোগ্য কোনো জমায়েত দেখা যায়নি। পরে দুপুর ২টার দিকে সরেজমিনে দেখা যায়, সড়কগুলোতে স্বাভাবিক যান চলাচল অব্যাহত রয়েছে। পথচারী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ স্বাভাবিকভাবেই চলাচল করছেন। অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা বিজিবি ও পুলিশের সদস্যদেরও ধীরে ধীরে সরে যেতে দেখা যায়।
দিনের শেষে রাজধানীর কোথাও সংঘর্ষ, ভাঙচুর, অবরোধ বা জনদুর্ভোগের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। সম্ভাব্য উত্তেজনা নিয়ে যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। ফলে প্রশাসনের আগাম নিরাপত্তা প্রস্তুতি এবং পরিস্থিতির শান্তিপূর্ণ অবস্থান—দুই দিকই দিনজুড়ে আলোচনায় ছিল।
বর্তমান আন্দোলনের পটভূমি তৈরি হয়েছে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা ঘিরে একাধিক বিতর্কের পর। গত ১৩ জুলাই প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলা ছাড়া দেশের বাকি অংশে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অনেক পরীক্ষার্থীকে কোমরসমান পানি অতিক্রম করে পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছাতে হয়। সেই দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং অভিভাবক, শিক্ষক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে পরীক্ষা আয়োজনের সময়োপযোগিতা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, এমন পরিস্থিতিতে পরীক্ষা নেওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য কতটা যৌক্তিক ছিল।
পরবর্তী সময়ে শিক্ষামন্ত্রীর একটি ফোনালাপের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়। অভিযোগ ওঠে, সেখানে পরীক্ষার্থীদের নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করা হয়েছে। একই সময় পদার্থবিজ্ঞান প্রথমপত্রের প্রশ্নে ভুল থাকার অভিযোগ সামনে আসে। এরপর হিসাববিজ্ঞান ও যুক্তিবিদ্যা প্রথমপত্র নিয়েও প্রশ্ন ওঠে, যা পরীক্ষা ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা ও মান নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করে।
এসব ঘটনার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা প্রথমে আট দফা এবং পরে তিন দফা দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। তাদের দাবির মধ্যে ছিল অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত করা, পদার্থবিজ্ঞানের ভুল প্রশ্নের জন্য পূর্ণ নম্বর প্রদান এবং শিক্ষামন্ত্রীর প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনা।
মঙ্গলবার রাতে জাতীয় সংসদে শিক্ষামন্ত্রী এ বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন এবং পদার্থবিজ্ঞান, হিসাববিজ্ঞান ও যুক্তিবিদ্যা প্রথমপত্রের পরীক্ষা পুনরায় নেওয়ার ঘোষণা দেন। তবে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের একটি অংশ এই সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট হয়নি। তাদের দাবি, শুধু পুনঃপরীক্ষা নয়, শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের দায় নির্ধারণ এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগও প্রয়োজন। সেই অবস্থান থেকেই ‘লংমার্চ টু শিক্ষা মন্ত্রণালয়’ কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়।
সর্বশেষ পরিস্থিতিতে রাজধানীর নীলক্ষেত, সায়েন্সল্যাব এবং আশপাশের এলাকায় স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রয়েছে। যদিও ঘোষিত কর্মসূচি বাস্তবে বড় ধরনের সমাবেশে রূপ নেয়নি, তবু শিক্ষার্থীদের উত্থাপিত দাবিগুলো নিয়ে জনপরিসরে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। শিক্ষা-সংক্রান্ত সাম্প্রতিক বিতর্ক, পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা এবং সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ—সবকিছুই এখন সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষা প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষের নিবিড় পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে উঠেছে।
মন্তব্য