খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৭ই জুলাই ২০২৬, ১২:১৭ এএম

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার পশ্চিম মাসদাইর এলাকায় গণপিটুনিতে এক যুবক নিহতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দায়ের করা হত্যা মামলায় নিরীহ মানুষ ও সামাজিক সংগঠনের সদস্যদের আসামি করার অভিযোগ উঠেছে। এই হয়রানিমূলক মামলার প্রতিবাদে এবং মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে ফতুল্লায় বিশাল বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সোমবার (৬ জুলাই) রাতে পশ্চিম মাসদাইর এলাকার সর্বস্তরের জনগণ এই কর্মসূচিতে অংশ নেন।
বিক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, গণপিটুনিতে নিহত ওই যুবকের নাম সিজান। তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় ছিনতাই, চাঁদাবাজি, প্রকাশ্য মাদকসেবন এবং কিশোর গ্যাং পরিচালনাসহ বিভিন্ন ধরনের গুরুতর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ছিল। সিজানের অপরাধচক্রের কারণে এলাকার সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাতে বাধ্য হয়েছেন। স্থানীয়দের দাবি, ঘটনার দিন সিজানকে মূলত পুলিশের কাছে সোপর্দ করার উদ্দেশ্যেই সাধারণ মানুষ আটকে রেখেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সেখানে উপস্থিত উত্তেজিত জনতার গণপিটুনিতে তার মৃত্যু হয়।
ফতুল্লার এই স্পর্শকাতর ঘটনা এবং মামলার বিবরণ সংক্রান্ত ১০টি মূল তথ্য নিচে ছক আকারে তুলে ধরা হলো:
| ক্র. নং | ঘটনার মূল দিক ও আইনি সূচক | সংশ্লিষ্ট বিবরণ ও তথ্য |
| ১ | ঘটনার মূল স্থান বা এলাকা | পশ্চিম মাসদাইর, ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ |
| ২ | গণপিটুনি ও মৃত্যুর সময়কাল | গত শনিবার রাত |
| ৩ | নিহত যুবকের নাম ও পরিচয় | সিজান (কথিত ছিনতাইকারী ও কিশোর গ্যাং লিডার) |
| ৪ | বিক্ষোভের তারিখ ও সময় | সোমবার (৬ জুলাই) রাত |
| ৫ | নিহতের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের মূল অভিযোগ | ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদকসেবন ও কিশোর গ্যাং পরিচালনা |
| ৬ | মামলার বাদী ও নিহতের সম্পর্ক | শিল্পী বেগম (নিহত সিজানের মা) |
| ৭ | মামলা দায়েরের স্থান | ফতুল্লা মডেল থানা |
| ৮ | নাম উল্লেখ করা আসামির সংখ্যা | ৬ জন (যার মধ্যে স্থানীয় মসজিদের ইমামও রয়েছেন) |
| ৯ | অজ্ঞাতপরিচয় আসামির সংখ্যা | ১৪ থেকে ১৫ জন |
| ১০ | তদন্তের বর্তমান অবস্থা (গ্রেপ্তার) | এখন পর্যন্ত কাউকেই গ্রেপ্তার করা হয়নি |
এলাকাবাসীর মূল আপত্তি এই মৃত্যুর পর দায়ের হওয়া মামলার ধরন নিয়ে। তাদের দাবি, এই ঘটনার পর স্থানীয় একটি মসজিদের ইমাম, এলাকার নামকরা সামাজিক সংগঠনের সদস্য এবং বেশ কয়েকজন নিরীহ বাসিন্দাকে সুনির্দিষ্টভাবে হত্যা মামলায় আসামি করা হয়েছে। এটি সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং হয়রানিমূলক। সোমবার রাতের বিক্ষোভ মিছিলটি পশ্চিম মাসদাইরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে। পরে এটি একটি বড় ধরনের প্রতিবাদ সমাবেশে পরিণত হয়।
সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে স্থানীয় এক মাছ ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, নিহত সিজান ও তার গ্যাংয়ের সহযোগীরা একাধিকবার তার পথরোধ করে ছিনতাই করেছে এবং জোরপূর্বক মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায় করেছে। অন্যদিকে, সমাবেশে অংশ নেওয়া এক নারী পোশাকশ্রমিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সিজানের মতো অপরাধীদের কারণে সন্ধ্যার পর মাসদাইর এলাকায় নারী ও শিশুদের একা চলাচল করা মোটেও নিরাপদ ছিল না। প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে অবিলম্বে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করার জোরালো দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে নিরীহ মানুষকে হয়রানি করা বন্ধ এবং কেবল প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানান বক্তারা।
এই বিষয়ে ফতুল্লা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মাহবুব আলম সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “নিহত সিজানের ঘটনায় থানায় একটি নিয়মিত হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে। লাশের ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পরই মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট ও প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। পুলিশ তদন্তের স্বার্থে সব বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখছে।” তিনি আরও জানান, এখন পর্যন্ত এই মামলায় কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। তদন্তের অগ্রগতি এবং পোস্টমর্টেম রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, স্থানীয়দের দাবি—ঘটনার ঠিক আগে এক যুবকের মোবাইল ফোন ছিনতাই ও সেটি বিক্রি করে দেওয়ার বিষয়ে সিজানের একটি স্বীকারোক্তিমূলক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। ওই ঘটনার জের ধরেই ক্ষুব্ধ জনতা তাকে আটকে রেখে গণপিটুনি দেয়, যা পরবর্তীতে হাসপাতালে নেওয়ার পর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
মন্তব্য