যুক্তরাষ্ট্র ও এশিয়াকেন্দ্রিক বাণিজ্যনীতি নিয়ে অর্থনীতিবিদদের উদ্বেগ

২১ মে ২০২৬, বৃহস্পতিবার রাতে সমাজ গবেষণা কেন্দ্র কর্তৃক আয়োজিত ‘বিএনপি সরকারের ১০০ দিন’ শীর্ষক একটি ওয়েবিনারে দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকরা বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক গতিপথ, বৈদেশিক বাণিজ্য এবং সুশাসন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন। উক্ত আলোচনায় বক্তারা বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত বা প্রস্তাবিত বাণিজ্য চুক্তির বিভিন্ন দিক এবং এশিয়াকেন্দ্রিক উদীয়মান প্রবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের করণীয় নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

বাণিজ্য ও পররাষ্ট্রনীতির পুনর্গঠন

আলোচনায় অংশ নিয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদরা মত প্রকাশ করেন যে, বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ও নীতিকে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে নতুন করে সাজানো প্রয়োজন। বিশেষ করে এশিয়াকেন্দ্রিক প্রবৃদ্ধির যে বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তা বিবেচনায় নিয়ে নীতি পুনর্গঠনের ওপর জোর দেন তারা। বক্তাদের মতে, কোনো নির্দিষ্ট দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দেশের স্বার্থ রক্ষা ও দরকষাকষির সক্ষমতা বৃদ্ধির তাগিদ দেওয়া হয়।

প্রধান আলোচনার ক্ষেত্রসমূহ

ওয়েবিনারে অর্থনীতিবিদরা কেবল বাণিজ্য নয়, বরং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির বেশ কিছু মৌলিক বিষয়ে তাদের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

  • কর আদায় ও রাজস্ব নীতি: জাতীয় বাজেটে অর্থের সংস্থান করতে কার্যকর কর আদায় ব্যবস্থার অভাব।

  • সামাজিক সুরক্ষা: ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির বাজারে সাধারণ মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী আরও শক্তিশালী করা।

  • সুশাসন ও জবাবদিহিতা: রাষ্ট্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।

  • রাজনৈতিক অগ্রাধিকার: বিএনপির বৈদেশিক নীতির অগ্রাধিকারসমূহ এবং সেগুলোর অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্লেষণ।

অর্থনীতিবিদদের প্রধান প্রস্তাবনা ও পর্যবেক্ষণ

আলোচ্য বিষয়অর্থনীতিবিদদের পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ
বাণিজ্যনীতিএশিয়াকেন্দ্রিক প্রবৃদ্ধির ধারাকে কাজে লাগিয়ে আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ করা।
বৈদেশিক সম্পর্ককোনো একক শক্তির ওপর নির্ভর না করে বহুমুখী বৈদেশিক বাণিজ্য নীতি গ্রহণ।
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারব্যাংক খাত ও রাজস্ব প্রশাসনে সুশাসন নিশ্চিত করে দুর্নীতি রোধ করা।
সামাজিক নিরাপত্তানিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং কার্যকর বণ্টন নিশ্চিত করা।

বিশেষজ্ঞ মতামত ও অংশগ্রহণকারী

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ ড. এম এম আকাশ। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান, যিনি দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ দেশের সম্পদের সুষম বণ্টন ও জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান আঞ্চলিক কানেক্টিভিটি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আইনি বাধ্যবাধকতা নিয়ে কথা বলেন। অন্যদিকে, সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান এবং প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বর্তমান সরকারের ১০০ দিনের কার্যক্রমের সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জসমূহ তুলে ধরেন।

বক্তারা সম্মিলিতভাবে উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি এশিয়ার পরাশক্তিগুলোর সাথে ভারসাম্য রক্ষা করাও সমান জরুরি। সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি না পেলে কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তিই দেশের জন্য কাঙ্ক্ষিত সুফল বয়ে আনবে না। তারা বিএনপি সরকারের বৈদেশিক নীতির অগ্রাধিকারসমূহ পর্যালোচনার পাশাপাশি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

সামাজিক গবেষণা কেন্দ্রের এই বিশেষ ওয়েবিনারটি বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি দিকনির্দেশনামূলক আলোচনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

উক্ত আলোচনায় উল্লিখিত প্রধান বিষয়গুলোর সারাংশ:

  • যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।

  • এশীয় দেশগুলোর সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করা।

  • অভ্যন্তরীণ সুশাসন ও কর আদায় ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা।

  • রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থনৈতিক কর্মসূচিতে জনগণের অংশগ্রহণ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।