ভোটের আগে রেমিট্যান্সে রেকর্ড গতি

নির্বাচনকে ঘিরে দেশে প্রবাসী আয়ের প্রবাহে নতুন গতি তৈরি হয়েছে। চলতি মাসের প্রথম নয় দিনে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকার সমপরিমাণ রেমিট্যান্স দেশে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে প্রবাসীরা মোট ১১৩ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার পাঠিয়েছেন, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৩ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা।

গত বছরের ফেব্রুয়ারির একই সময়—প্রথম নয় দিনে—প্রবাসী আয় ছিল ৮৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার। সেই তুলনায় এবার প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৩ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই বৃদ্ধি কেবল মৌসুমি নয়; বরং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে এর যোগসূত্র রয়েছে।

মাসভিত্তিক প্রবাসী আয়ের চিত্র

চলতি বছরের জানুয়ারিতে দেশে এসেছে ৩১৭ কোটি ডলার রেমিট্যান্স। তার আগের মাস ডিসেম্বরে এসেছিল ৩২২ কোটি ডলার। এর আগে টানা পাঁচ মাস প্রবাসী আয় তিন বিলিয়ন ডলারের নিচে ছিল। অর্থাৎ বছরের শুরুতেই রেমিট্যান্স প্রবাহে একটি দৃশ্যমান উল্লম্ফন দেখা যাচ্ছে।

নিচে সাম্প্রতিক মাসগুলোর প্রবাসী আয়ের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:

সময়কালপ্রবাসী আয় (কোটি ডলার)মন্তব্য
ডিসেম্বর৩২২পাঁচ মাস পর ৩ বিলিয়ন ছাড়ায়
জানুয়ারি৩১৭ধারাবাহিক শক্তিশালী প্রবাহ
ফেব্রুয়ারি (প্রথম ৯ দিন)১১৩.৫০দৈনিক গড় প্রায় ১২.৬ কোটি ডলার
ফেব্রুয়ারি (গত বছর, প্রথম ৯ দিন)৮৬.৬০প্রবৃদ্ধি ৩২.৩%

ব্যাংক খাতের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সাধারণত দুই ঈদের আগে প্রবাসী আয় বৃদ্ধি পায়। তবে এবারের প্রবাহের পেছনে নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট অর্থ স্থানান্তরের বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। যেসব দেশে প্রবাসী বাংলাদেশির সংখ্যা বেশি—বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও মালয়েশিয়া—সেসব দেশ থেকেই বড় অংশের রেমিট্যান্স আসছে। অনেকে মনে করছেন, প্রবাসীদের মাধ্যমে রাজনৈতিক তহবিল সংগ্রহের একটি অংশও বৈধ চ্যানেলে দেশে আসছে।

রিজার্ভে ইতিবাচক প্রভাব

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মোট ৩ হাজার ২৮২ কোটি ডলারের প্রবাসী আয় দেশে এসেছে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের প্রায় সমপরিমাণ। শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহের ফলে গত বছর ডলারের বাজারে তীব্র সংকট তৈরি হয়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ডলার কিনে রিজার্ভ বাড়িয়েছে এবং বাজার স্থিতিশীল রাখতে ভূমিকা রেখেছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি প্রবাসী আয়ই বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস। বিশেষ করে নির্বাচন-পূর্ব সময়ে এই প্রবাহ অর্থনীতিকে তাৎক্ষণিক স্বস্তি দিচ্ছে।

ব্যাংক বন্ধ, উত্তোলনে সীমাবদ্ধতা

তবে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়লেও সুবিধাভোগীদের জন্য কিছু সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। নির্বাচনের কারণে টানা চার দিন ব্যাংক শাখা বন্ধ থাকায় অনেকেই সরাসরি কাউন্টার থেকে টাকা তুলতে পারছেন না। যাঁদের এটিএম কার্ড রয়েছে, তাঁরা বুথ থেকে অর্থ উত্তোলন করতে পারছেন; বর্তমানে ব্যাংকভেদে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত তোলা যায়।

এদিকে এক ব্যাংক হিসাব থেকে অন্য ব্যাংক হিসাবে অর্থ স্থানান্তর সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস—যেমন বিকাশ, রকেট ও নগদ—সীমিত আকারে চালু থাকায় এসব মাধ্যমেও রেমিট্যান্স উত্তোলনে বিঘ্ন ঘটছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ অর্থনীতিতে নতুন গতি এনেছে। তবে এই প্রবাহ কতটা স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, প্রণোদনা নীতি এবং বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর প্রতি আস্থার ওপর।