খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ই জুন ২০২৬, ১০:৩৮ পিএম

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে আকস্মিকভাবে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন লেবার পার্টির নেতা কিয়ার স্টারমার। এই ঘোষণার মাধ্যমে দেশটির শাসন ক্ষমতায় লেবার পার্টির প্রায় ২৩ মাসের নেতৃত্বের অবসান ঘটল। স্টারমারের এই সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তের ফলে গত এক দশকে যুক্তরাজ্য তার সপ্তম প্রধানমন্ত্রী পেতে চলেছে। সোমবার ডাউনিং স্ট্রিটের ১০ নম্বর বাসভবনের সামনে নিজের স্ত্রীকে পাশে নিয়ে দেশবাসীর উদ্দেশ্যে দেওয়া এক ভাষณ์ে স্টারমার এই ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে তিনি লেবার পার্টির প্রধানের পদ থেকেও পদত্যাগ করার কথা জানান। তবে দেশের পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন সম্পন্ন না হওয়া এবং নতুন নেতৃত্ব নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন এবং সুষ্ঠুভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর নিশ্চিত করতে সাধ্যমতো কাজ করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বক্তব্য শেষ করার পর সেখানে উপস্থিত তাঁর সমর্থকরা করতালির মাধ্যমে তাঁকে বিদায় জানান। স্টারমারের এই সিদ্ধান্তের ফলে তাঁর দলীয় প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যান্ডি বার্নহামের কাছে শান্তিপূর্ণ এবং সুশৃঙ্খল উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি সুনির্দিষ্ট পথ তৈরি হয়েছে।
কয়েক দিনের তীব্র রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং লেবার পার্টির সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিসভার জ্যেষ্ঠ সদস্যদের ধারাবাহিক ও তীব্র চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করতে বাধ্য হন কিয়ার স্টারমার। অথচ এর পূর্ব পর্যন্ত তিনি তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সব ধরনের অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে শীর্ষ পদে টিকে থাকার বিষয়ে অত্যন্ত দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন। সরকারের ভেতরে বিভিন্ন ধরনের কেলেঙ্কারি এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের একের পর এক পদত্যাগের কারণে স্টারমারের রাজনৈতিক অবস্থান ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তবুও তিনি ক্ষমতা না ছাড়ার পক্ষে অনড় অবস্থান ঘোষণা করেছিলেন। তবে মেকারফিল্ড আসনের উপনির্বাচনে অ্যান্ডি বার্নহামের বিশাল বিজয় স্টারমারের নেতৃত্বের জন্য চূড়ান্ত ধাক্কা হিসেবে প্রমাণিত হয়, যার পরপরই তিনি পদত্যাগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন।
প্রকৃতপক্ষে স্টারমারের এই পদত্যাগ কোনো বিচ্ছিন্ন বা আকস্মিক ঘটনা ছিল না। বেশ কয়েক মাস ধরেই লেবার পার্টির অভ্যন্তরে তাঁর বিরুদ্ধে অসন্তোষ ও চাপ তীব্র হচ্ছিল। তাঁর দলীয় আইন প্রণেতারা চাচ্ছিলেন তিনি যেন দ্রুত নেতৃত্ব হস্তান্তর করে দলের শীর্ষ পদ ছেড়ে দেন। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে লেবার পার্টি ক্ষমতায় এলেও বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ কেলেঙ্কারির কারণে দলটির জনপ্রিয়তা দ্রুত হ্রাস পায়। একই সময়ে দলটির উদারপন্থী ভোটারদের একটি বড় অংশ পরিবেশবাদী গ্রিন পার্টির দিকে ঝুঁকে পড়ায় লেবার পার্টির নীতিনির্ধারকদের মধ্যে উদ্বেগ আরও বৃদ্ধি পায়। অনেক সংসদ সদস্য আশঙ্কা করছিলেন যে, পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে নাইজেল ফারাজের দলের রাজনৈতিক উত্থান লেবার পার্টির জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন, নীতিগত অবস্থান পরিবর্তন এবং সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনার অভাবের কারণে স্টারমার সরকার ক্রমাগত সমালোচনার মুখোমুখি হচ্ছিল।
কিয়ার স্টারমার সরকার বেশ কিছু আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিতর্কেও জড়িয়ে পড়েছিল। এর মধ্যে অন্যতম বড় বিতর্কটি তৈরি হয় পিটার ম্যান্ডেলসনকে কেন্দ্র করে। দণ্ডিত মার্কিন যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে পরিচিত ম্যান্ডেলসনকে যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটেনের নতুন রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেন স্টারমার। এই নিয়োগের পর স্টারমার এই স্পর্শকাতর বিষয়ে কতটুকু জানতেন বা কখন জেনেছিলেন—তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রশ্নের সৃষ্টি হয়। এছাড়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাজ্যের অভিবাসন নীতি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংক্রান্ত নীতিকে স্টারমারের সম্ভাব্য পদত্যাগের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তবে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কিছু প্রশংসনীয় ভূমিকায় ছিলেন স্টারমার; যেমন রাশিয়ার বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে ইউক্রেনের জন্য ইউরোপীয় সমর্থন বজায় রাখা এবং ইরান যুদ্ধের আঞ্চলিক প্রভাব প্রশমনে তাঁর প্রচেষ্টা উল্লেখযোগ্য ছিল।
তবে সব সমালোচনাকে ছাপিয়ে সাম্প্রতিক স্থানীয় কাউন্সিল ও আঞ্চলিক পার্লামেন্টের নির্বাচনে লেবার পার্টির চরম বিপর্যয়ই স্টারমারের বিদায় ঘণ্টা বাজিয়ে দেয়। জনমতের সূচক হিসেবে বিবেচিত এই নির্বাচনগুলোতে লেবার পার্টির ধারাবাহিক খারাপ ফলাফলের কারণে দলের একাধিক জ্যেষ্ঠ রাজনীতিক পদত্যাগ করেন এবং স্টারমারের পদত্যাগের দাবি তোলেন। শুরুতে স্টারমার এই দাবি প্রত্যাখ্যান করলেও দলের প্রভাবশালী প্রতিদ্বন্দ্বীরা তাঁর নেতৃত্বকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করার স্পষ্ট ইঙ্গিত দেন। যুক্তরাজ্যের সংসদীয় নিয়ম অনুযায়ী, পার্লামেন্টে যে দলের আসন সবচেয়ে বেশি থাকে, সেই দলের নেতাই প্রধানমন্ত্রী মনোনীত হন। পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত লেবার পার্টিই সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে বহাল থাকবে।
যুক্তরাজ্যের এই চলমান রাজনৈতিক সংকটের মূল সূত্রপাত ঘটেছিল ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোটের মাধ্যমে। সেই বিতর্কিত গণভোটে ব্রিটিশ নাগরিকরা ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে রায় দেন, যা দেশের চিরাচরিত রাজনৈতিক আনুগত্য ও দ্বিদলীয় ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের কনজারভেটিভ সরকার ২০১৫ সালের নির্বাচনে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে তারা ক্ষমতায় ফিরলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ নিয়ে গণভোট করবে। নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্যামেরন ডাউনিং স্ট্রিটে থাকলেও গণভোটে তাঁর সমর্থিত থাকার পক্ষে ‘রিমেইন’ শিবির পরাজিত হলে ২০১৬ সালের জুলাইয়ে তিনি পদত্যাগ করেন। এরপর থেকে একে একে তেরেসা মে ২০১৯ সালে ব্রেক্সিট চুক্তি পাসে ব্যর্থ হয়ে, বরিস জনসন ২০২২ সালে বিভিন্ন কেলেঙ্কারির জেরে, লিজ ট্রাস মাত্র ৪৯ দিন দায়িত্বে থেকে এবং ঋষি সুনাক ২০২৪ সালের নির্বাচনে কনজারভেটিভদের বড় পরাজয়ের পর ক্ষমতা ছাড়েন। সর্বশেষ এই তালিকায় যুক্ত হলেন লেবার পার্টির কিয়ার স্টারমার।
এই রাজনৈতিক শূন্যতাকে কাজে লাগিয়ে ব্রেক্সিট আন্দোলনের অন্যতম রূপকার এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের আদর্শিক মিত্র নাইজেল ফারাজের দল ‘রিফর্ম ইউকে’ সাম্প্রতিক নির্বাচনে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে এবং ব্রিটিশ রাজনীতির মূলধারায় উঠে এসেছে। জনমত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘মোর ইন কমন’-এর যুক্তরাজ্য পরিচালক লুক ট্রাইল বলেন, ২০১৬ সালের পর থেকে প্রতিটি নির্বাচনই ছিল মূলত রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি জনগণের অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ, যা এই ধারাবাহিক অস্থিরতার মূল কারণ। বর্তমানে স্টারমারের উত্তরসূরি হিসেবে অ্যান্ডি বার্নহামের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে, যিনি সম্প্রতি মেকারফিল্ড আসনের উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে পার্লামেন্টে নিজের অবস্থান ও প্রধানমন্ত্রিত্বের দাবি সুগম করেছেন। এছাড়া ওয়েস স্ট্রিটিংও এই প্রতিযোগিতায় নামতে পারেন, তবে চূড়ান্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য লেবার পার্টির অন্তত ৮১ জন সংসদ সদস্যের সমর্থনের প্রয়োজন হবে।
মন্তব্য