১৯৩০ সালে উরুগুয়ের মন্টেভিডিওতে যে ফুটবল মহাযজ্ঞের সূচনা হয়েছিল, তা আজ শতবর্ষের দ্বারপ্রান্তে। এই সুদীর্ঘ পথচলায় পেলে, গারিঞ্চা বা হালের মেসি-রোনালদোরা ফুটবলকে সমৃদ্ধ করলেও ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। এই আসরটি ছিল এককভাবে একজন মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের মঞ্চ, যেখানে ডিয়েগো আরমান্ডো ম্যারাডোনা নামক এক জাদুকর ফুটবলীয় ব্যাকরণকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন।
Table of Contents
কলম্বিয়ার সংকট ও মেক্সিকোর দায়িত্ব লাভ
১৯৮২ বিশ্বকাপ সমাপ্তির পর পরবর্তী আসরের আয়োজক হিসেবে কলম্বিয়ার নাম নির্ধারিত ছিল। তবে ১৯৮২ সালের ২৬ অক্টোবর কলম্বিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বেলিসারিও বেটানকুর অর্থনৈতিক সংকটের কারণ দেখিয়ে আয়োজক পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। তৎকালীন ফিফা নিয়মানুযায়ী ২৪টি দলের জন্য ন্যূনতম ১০টি আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম প্রয়োজন ছিল, যা তৈরি করা কলম্বিয়ার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
এই পরিস্থিতিতে ১৯৮৩ সালের ১৯ মে ফিফা মেক্সিকোকে আয়োজক হিসেবে ঘোষণা করে। ফলে মেক্সিকো ফুটবল ইতিহাসের প্রথম দেশ হিসেবে দুইবার (১৯৭০ ও ১৯৮৬) বিশ্বকাপ আয়োজনের গৌরব অর্জন করে। যদিও টুর্নামেন্ট শুরুর মাত্র আট মাস আগে ১৯৮৫ সালের সেপ্টেম্বরে এক ভয়াবহ ভূমিকম্পে মেক্সিকো সিটি বিধ্বস্ত হয়েছিল এবং প্রায় ১০ থেকে ৪০ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন, কিন্তু অলৌকিকভাবে বিশ্বকাপের জন্য নির্ধারিত ১২টি স্টেডিয়াম অক্ষত থাকায় আসরটি যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হয়।
প্রতিযোগিতার নতুন ফরম্যাট ও পরিসংখ্যান
১৯৮৬ বিশ্বকাপে ২৪টি দলকে মোট ৬টি গ্রুপে বিভক্ত করা হয়েছিল। নকআউট পর্বের বিন্যাসেও পরিবর্তন আনা হয়েছিল, যেখানে প্রতিটি গ্রুপের শীর্ষ দুটি দল এবং তৃতীয় স্থানে থাকা সেরা চারটি দল দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠার সুযোগ পায়।
১৯৮৬ বিশ্বকাপের সংক্ষিপ্ত পরিসংখ্যান:
| বিষয় | তথ্য |
| আয়োজক দেশ | মেক্সিকো |
| মোট ভেন্যু | ১২টি (৯টি শহর) |
| অংশগ্রহণকারী দল | ২৪টি |
| মোট ম্যাচ সংখ্যা | ৫২টি |
| গোল সংখ্যা | ১৩২টি (ম্যাচ প্রতি ২.৫৪) |
| সর্বোচ্চ গোলদাতা | গ্যারি লিনেকার (৬টি গোল) |
| সেরা খেলোয়াড় (গোল্ডেন বল) | ডিয়েগো ম্যারাডোনা |
| চ্যাম্পিয়ন | আর্জেন্টিনা (২য় শিরোপা) |
| রানার্স-আপ | পশ্চিম জার্মানি |
ম্যারাডোনার জাদুকরি নৈপুণ্য
কার্লোস বিলার্দোর অধীনে ১৯৮৬ সালের আর্জেন্টিনা দলটিকে ফুটবল ইতিহাস আজও ‘ম্যারাডোনা এবং বাকি ১০ জন’ হিসেবে স্মরণ করে। ১৯৬২ সালে পেলে চোট পেয়ে ছিটকে যাওয়ার পরেও ব্রাজিল চ্যাম্পিয়ন হতে পেরেছিল কারণ তাদের স্কোয়াডে গারিঞ্চা, ভাভা বা জেয়ারজিনহোর মতো তারকারা ছিলেন। কিন্তু ছিয়াশির বিশ্বকাপে ম্যারাডোনা ছিলেন একাধারে অধিনায়ক, প্লে-মেকার এবং প্রধান গোলদাতা।
কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে করা তাঁর দুটি গোল ইতিহাসের দুই বিপরীত মেরুর সাক্ষী। প্রথম গোলটি ছিল বিতর্কিত ‘লা মানো দে দিওস’ বা ‘ঈশ্বরের হাত’ গোল। এর মাত্র চার মিনিট পরেই তিনি মাঝমাঠ থেকে একাকী দৌড় শুরু করে পাঁচজন ইংলিশ ডিফেন্ডার ও গোলরক্ষককে কাটিয়ে যে গোলটি করেন, তা ফিফা কর্তৃক ‘শতাব্দীর সেরা গোল’ হিসেবে স্বীকৃত। সেমিফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষেও তিনি একক জাদুতে দলকে ফাইনালে নিয়ে যান।
বিচিত্র সব ঘটনা ও বাস্তবতা
এই বিশ্বকাপে যেমন ছিল শৈল্পিক ফুটবলের ছোঁয়া, তেমনি ছিল কিছু অদ্ভুত ও মজার ঘটনা:
কানাডার ইনডোর ফুটবলার: কানাডা তাদের স্কোয়াডে মাত্র ১৮ জন খেলোয়াড় নিয়ে মেক্সিকো পৌঁছেছিল। তাদের স্কোয়াডের অধিকাংশ সদস্যই ছিলেন মূলত ইনডোর ফুটবলের খেলোয়াড়। বাকি ৪ জন খেলোয়াড়কে তারা দেশে ফোনের পাশে অপেক্ষায় থাকতে বলেছিল যেন জরুরি প্রয়োজনে ডাকা যায়, যদিও সেই প্রয়োজন শেষ পর্যন্ত পড়েনি।
বিজ্ঞাপন বনাম বাস্তবতা: মেক্সিকোর পোস্টার বয় হুগো সানচেজকে নিয়ে কোকা-কোলা একটি বিজ্ঞাপন তৈরি করেছিল যেখানে তাঁকে পেনাল্টি থেকে গোল করতে দেখা যায়। কিন্তু প্যারাগুয়ের বিপক্ষে বাস্তব ম্যাচে সানচেজ পেনাল্টি মিস করেন, ফলে বিজ্ঞাপনের চিত্রনাট্য বাস্তবায়িত হতে পারেনি।
বিলার্দোর কুসংস্কার: আর্জেন্টিনার কোচ কার্লোস বিলার্দো ছিলেন অত্যন্ত কুসংস্কারাচ্ছন্ন। প্রতি ম্যাচের আগে নির্দিষ্ট মলে কফি খাওয়া, গোলরক্ষক পুম্পিদোকে দিয়ে বিল মেটানো এবং বাসে নির্দিষ্ট একটি গান (জিগান্তে, চিকিতো) বাজানোর মতো অদ্ভুত নিয়ম মেনে চলতেন তিনি। এমনকি বিশ্ব জয়ের রাতেও বিলার্দো অখুশি ছিলেন কারণ জার্মানি দুটি গোলই করেছিল কর্নার থেকে, যা তাঁর রক্ষণাত্মক কৌশলের পরিপন্থী ছিল।
মেক্সিকোর তীব্র গরম আর প্রখর রোদে অনুষ্ঠিত এই বিশ্বকাপটি শেষ পর্যন্ত ম্যারাডোনার মহাকাব্যে রূপ নেয়। ২৯ জুন ফাইনাল ম্যাচে পশ্চিম জার্মানিকে ৩-২ গোলে পরাজিত করে আর্জেন্টিনা দ্বিতীয়বারের মতো সোনালি ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরে, যা আজও বিশ্ব ফুটবলের এক চিরস্থায়ী রোমাঞ্চকর স্মৃতি হয়ে আছে।
