ডিফেন্ডিং বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা বুধবার সকালে কানসাসের অ্যারোহেড স্টেডিয়ামে আলজেরিয়াকে ৩-০ গোলে পরাজিত করে তাদের বিশ্বকাপ মিশন শুরু করেছে। আর্জেন্টিনার এই দাপুটে জয়ের নায়ক ছিলেন দলটির অধিনায়ক লিওনেল মেসি, যিনি দুর্দান্ত হ্যাটট্রিক করে ইতিহাসের পাতায় নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেছেন। এই হ্যাটট্রিকের মাধ্যমে ৩৮ বছর বয়সী এই তারকা খেলোয়াড় বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসার ১৬ গোলের রেকর্ডের সমতায় পৌঁছেছেন।
দূরপাল্লার অসাধারণ এক শটে প্রথম গোল করার পর ম্যাচের ৭৬ মিনিটে তিনি নিজের হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন। এই অনবদ্য পারফরম্যান্সের ফলে তিনি গোল্ডেন বুটের দৌড়েও এগিয়ে গেছেন এবং সেনেগালের বিপক্ষে জোড়া গোল করা কিলিয়ান এমবাপ্পেকে পেছনে ফেলেছেন।
Table of Contents
ম্যাচে লিওনেল মেসির বিতর্কিত ট্যাকল ও রেফারিং
আর্জেন্টিনার মাঠের পারফরম্যান্স যতটা দাপুটে ছিল, মাঠের ভেতরের একটি ঘটনা ততটাই বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে আলজেরিয়ার সেন্টার-ব্যাক আইসা মান্দিকে করা লিওনেল মেসির একটি ট্যাকল নিয়ে ফুটবল বিশ্বে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
ঘটনার বিবরণ: টেলিভিশন রিপ্লেতে পরিষ্কারভাবে দেখা যায় যে, আর্জেন্টাইন অধিনায়কের বুটের তলা সরাসরি আইসা মান্দির পায়ের পেছনের অংশে আঘাত করেছিল।
আলজেরিয়ার প্রতিক্রিয়া: ঘটনাটি ঘটার সাথে সাথেই আলজেরিয়ার বেঞ্চ থেকে মেসিকে সরাসরি লাল কার্ড দেখানোর জন্য জোর দাবি তোলা হয়।
রেফারির সিদ্ধান্ত: ম্যাচের প্রধান রেফারি সিমন মারচিনিয়াক এই ফাউলের জন্য লিওনেল মেসিকে কোনো ধরনের কার্ড দেখাননি। এমনকি ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) কক্ষ থেকেও ঘটনাটি পুনর্বিবেচনার জন্য তাকে মাঠের পাশের মনিটরে দেখার অনুরোধ করা হয়নি।
রেফারি ও ভিএআরের এই নিষ্ক্রিয়তা ফুটবল অঙ্গনে একটি পুরোনো বিতর্ককে নতুন করে উস্কে দিয়েছে যে, ফুটবলের বড় তারকারা কি মাঠের ভেতরে রেফারিদের কাছ থেকে বিশেষ কোনো অন্যায় সুবিধা পেয়ে থাকেন?
ফুটবল পণ্ডিতদের বিশ্লেষণ ও তীব্র সমালোচনা
ম্যাচ শেষ হওয়ার পর ইএসপিএনের ফুটবল বিশ্লেষক ও পণ্ডিত আলে মোরেনো এবং নেদুম ওনুওহা রেফারির এই বিতর্কিত ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেছেন। তারা ম্যাচ-পরবর্তী আলোচনায় ভিএআর এবং মাঠের রেফারি উভয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে গভীর বিস্ময় প্রকাশ করেন।
ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ভিএআরের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
উভয় ফুটবল বিশ্লেষকই এই ম্যাচে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ভিএআরের কার্যকারিতা ও ভূমিকা নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন। আলে মোরেনোর মতে, সরাসরি ভিডিও ফুটেজ দেখলেই বোঝা যাচ্ছিল যে এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক একটি চ্যালেঞ্জ ছিল। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেন রেফারিকে মাঠের মনিটরে ডেকে এনে ঘটনাটি পুনরায় দেখতে বলা হলো না? তিনি যোগ করেন:
“আমি মেসিকে ভালোবাসি, কিন্তু এটাকে লাল কার্ডই হওয়া উচিত ছিল।”
নেদুম ওনুওহাও একই সুর মিলিয়ে বলেন, ম্যাচের এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তটি পুরোপুরি মিস হয়ে গেছে। তিনি লক্ষ্য করেছেন যে, আলজেরিয়ার খেলোয়াড় আইসা মান্দি যখন মাটিতে পড়ে ছিলেন, তখন মেসির মুখেও এক ধরনের উদ্বেগের ছাপ দেখা যাচ্ছিল। কারণ মেসি নিজেও বুঝতে পেরেছিলেন যে এই বিপজ্জনক ট্যাকলের কারণে তিনি বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে পারেন। ওনুওহা বলেন, “ভিএআর যদি এটি দেখে বলে সব ঠিক আছে, তাহলে সেটা আমার কাছে অবিশ্বাস্য।”
আর্জেন্টিনার স্বস্তি ও গ্রুপ পর্বের ভবিষ্যৎ
ম্যাচের প্রধান রেফারি সিমন মারচিনিয়াক এবং ভিএআরের এই বিতর্কিত সিদ্ধান্তটি শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনার জন্য অনেক বড় স্বস্তি বয়ে এনেছে। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের প্রধান তারকা ও অধিনায়ক লিওনেল মেসি যদি এই ম্যাচে লাল কার্ড পেতেন কিংবা পরবর্তীতে ম্যাচ নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হতেন, তবে তা দলটির শিরোপা ধরে রাখার মিশনে একটি মারাত্মক নেতিবাচক ধাক্কা হতে পারত।
কোনো ধরনের কার্ডের মুখোমুখি না হওয়ায় মেসি এখন সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা মুক্ত অবস্থায় গ্রুপ পর্বের বাকি ম্যাচগুলোর দিকে মনোযোগ দিতে পারছেন। এর ফলে একদিকে আর্জেন্টিনা দলের স্বস্তি ফিরে এসেছে, অন্যদিকে মেসি কোনো বাধা ছাড়াই বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোলদাতাদের তালিকায় নিজের অবস্থানকে আরও উঁচুতে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। মাঠের এই তীব্র বিতর্ক সত্ত্বেও আলজেরিয়ার বিপক্ষে ৩-০ গোলের বড় জয়টি আর্জেন্টিনাকে পূর্ণ ৩ পয়েন্ট এনে দিয়েছে এবং টুর্নামেন্টে তাদের শুভ সূচনা নিশ্চিত করেছে।
