খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৯ই আগস্ট ২০২৬, ৩:২৪ পিএম

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে মিশুকচালক ওয়ালি উল্লাহকে হত্যা করে তাঁর মিশুক ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে, চার থেকে পাঁচ সদস্যের একটি সংঘবদ্ধ চক্র পরিকল্পিতভাবে মিশুক ভাড়া করে নির্জন এলাকায় নিয়ে চালককে হত্যা করার পর গাড়ি ও মোবাইল ফোন নিয়ে পালিয়ে যায়।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন আওলাদ হোসেন (২৬) ও শাহিন (৩১)। তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নিহত ওয়ালি উল্লাহর ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ও ছিনতাই হওয়া মিশুক উদ্ধার করা হয়েছে। রোববার (৯ আগস্ট) দুপুরে পিবিআই নারায়ণগঞ্জ জেলা কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তদন্তের এসব তথ্য জানানো হয়।
পিবিআই সূত্রে জানা যায়, গত ৫ জুলাই অসুস্থ বাবার পরিবর্তে মিশুক চালাতে বাড়ি থেকে বের হন ২০ বছর বয়সী ওয়ালি উল্লাহ। কিন্তু সেদিন আর তিনি বাড়িতে ফেরেননি। পরিবারের সদস্যরা তাঁর মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। পরদিন ৬ জুলাই তাঁর নিখোঁজের ঘটনায় সোনারগাঁ থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়।
তবে নিখোঁজের বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পরদিনই মেলে ভয়াবহ পরিণতির খবর। ৬ জুলাই আড়াইহাজার উপজেলার উচিতপুরা ইউনিয়নের গ্রুপদী গ্রামের একটি নির্জন স্থান থেকে ওয়ালি উল্লাহর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাঁর শরীরে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন ছিল। মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় স্থানীয় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
পরে নিহতের বাবা হারুন রশিদ অজ্ঞাতনামা পাঁচ থেকে ছয়জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন। মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব নেয় পিবিআই। তদন্তকারীরা হত্যার কারণ, মিশুকের অবস্থান এবং ঘটনার আগে ও পরে চালকের চলাচলের তথ্য যাচাই শুরু করেন।
তদন্তের অংশ হিসেবে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং মিশুকটি যে পথ দিয়ে চলাচল করেছিল, সেই রুট বিশ্লেষণ করা হয়। এসব তথ্যের ভিত্তিতে সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করার চেষ্টা চালাতে থাকে তদন্তকারী দল।
ধারাবাহিক তদন্তের একপর্যায়ে গত ২ আগস্ট সোনারগাঁ এলাকা থেকে আওলাদ হোসেন ও শাহিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত আরও এগিয়ে যায়।
পিবিআই জানায়, ৬ আগস্ট শাহিনের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ওয়ালি উল্লাহর ব্যবহৃত স্যামসাং মোবাইল ফোন এবং একটি বাংলালিংক সিম উদ্ধার করা হয়। এরপর ৭ আগস্ট মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার ভবেরচর এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয় ছিনতাই হওয়া মিশুকটি।
তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার দুই আসামিসহ চার থেকে পাঁচ সদস্যের একটি সংঘবদ্ধ চক্র এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত। চক্রটি নারায়ণগঞ্জের বারদী অটোস্ট্যান্ড থেকে পরিকল্পিতভাবে ওয়ালি উল্লাহর মিশুক ভাড়া করে। পরে তারা আড়াইহাজারের সুলতানশাদী বাজারের দিকে যায়। সেখান থেকে ফেরার পথে গ্রুপদী গ্রামের একটি নির্জন স্থানে পৌঁছানোর পর চালক ওয়ালি উল্লাহকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়। এতে তাঁর মৃত্যু হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
হত্যার পর চক্রের সদস্যরা ওয়ালি উল্লাহর মিশুক ও মোবাইল ফোন নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। তদন্তে আরও তথ্য পাওয়া গেছে, পরে ছিনতাই করা মিশুকটি মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার ভবেরচর এলাকায় বিক্রি করে দেওয়া হয়।
মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি আসে শাহিনের জবানবন্দিতে। পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষে গত ৮ আগস্ট তাঁকে আদালতে হাজির করা হয়। সেখানে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় তিনি হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে স্বেচ্ছায় জবানবন্দি দেন।
পিবিআই নারায়ণগঞ্জ জেলার পুলিশ সুপার মো. মোস্তফা কামাল রাশেদ বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি, সিসিটিভি ফুটেজ, গোয়েন্দা তথ্য এবং ধারাবাহিক তদন্তের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উদঘাটন করা হয়েছে। ঘটনায় জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের পাশাপাশি তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
তদন্তকারীদের মতে, নিহতের মিশুক ও মোবাইল ফোন উদ্ধার মামলাটির গুরুত্বপূর্ণ আলামত উদ্ধারের ক্ষেত্রে অগ্রগতি এনে দিয়েছে। তবে সংঘবদ্ধ চক্রটির বাকি সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার এবং হত্যাকাণ্ডে প্রত্যেকের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা যাচাইয়ের কাজ এখনও চলছে।
মন্তব্য