খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ই জুন ২০২৬, ৪:৪৪ পিএম

সরকার দেশে ব্যবসা শুরু করার প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, দ্রুত এবং বিনিয়োগবান্ধব করতে একাধিক প্রশাসনিক ও নীতিগত সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, একাধিক ধাপের লাইসেন্সিং ব্যবস্থা এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ার ধীরগতির কারণে একটি নতুন ব্যবসা শুরু করতে উদ্যোক্তাদের প্রায় এক বছর পর্যন্ত সময় ব্যয় করতে হতো। এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের লক্ষ্যে সরকার এখন ব্যবসা শুরু করার সময়সীমা কমিয়ে মাত্র ১৪ দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
তিনি আরও জানান, পরিকল্পনার আওতায় কোম্পানি নিবন্ধন, প্রয়োজনীয় অনুমোদন, কর শনাক্তকরণ নম্বর গ্রহণসহ মৌলিক প্রক্রিয়াগুলোকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার অধীনে আনা হবে। এর ফলে উদ্যোক্তারা একই প্ল্যাটফর্মে দ্রুত সেবা পাবেন এবং অপ্রয়োজনীয় দপ্তর ভ্রমণ কমে যাবে। আদর্শ পরিস্থিতিতে কোম্পানি গঠনের ১৫তম দিনের মধ্যেই যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলার সুযোগ তৈরি করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে অনুষ্ঠিত “সহনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সরবরাহ ব্যবস্থা, বিনিয়োগ, বাণিজ্য এবং শোভন কর্মসংস্থান এজেন্ডা সমন্বয়” শীর্ষক আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সহযোগিতায়।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতি বিষয়ক কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের যে সময়সীমা পেয়েছে, সেটিকে শুধু সময় বৃদ্ধির সুযোগ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতিমূলক পর্ব, যার মাধ্যমে দেশকে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা জোরদার, উৎপাদন খাত বৈচিত্র্যকরণ এবং উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত হতে হবে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক বাজেটে একটি গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির যে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তা কেবল নীতিগত বক্তব্য নয়; বরং এটি সরকারের অর্থনৈতিক কৌশলের মূল ভিত্তি। ব্যবসা শুরু করার প্রক্রিয়া সহজীকরণ, লাইসেন্সিং জটিলতা হ্রাস এবং বাজার সম্প্রসারণে বৈচিত্র্য আনা সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে কাজ করছে।
বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীরা এখন কেবল লাভের হিসাব নয়, বরং স্বচ্ছতা, টেকসই উন্নয়ন, শ্রম অধিকার, মানবাধিকার সুরক্ষা, পরিবেশগত দায়িত্ব এবং নৈতিক ব্যবসায়িক আচরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং নতুন মানদণ্ডের ভিত্তিতে পুনর্গঠিত হচ্ছে।
এই পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি “দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক আচরণ সেল” গঠন করা হয়েছে। এই সেল সরকারি সংস্থা, নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী সংগঠন, শ্রমিক প্রতিনিধি এবং উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করবে বলে জানানো হয়।
সরকারের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হিসেবে তিনি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন কাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠিত করা। এ লক্ষ্যে নীতিগত সংস্কার অব্যাহত থাকবে এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ আরও প্রতিযোগিতামূলক করা হবে।
আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় দেশের অবস্থান শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। উপস্থিত ছিলেন ইউরোপীয় অঞ্চলের একজন প্রতিনিধি, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের একজন নির্বাহী সদস্য, জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
বাণিজ্যমন্ত্রী আরও জানান, ব্যবসা শুরু প্রক্রিয়া সহজীকরণের জন্য একটি পৃথক কমিটি কাজ করছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন ধাপে সময় কমানোর সম্ভাবনা চিহ্নিত করা হয়েছে। আগামী মাসে এই সংস্কার বাস্তবায়নের বিস্তারিত রোডম্যাপ ঘোষণা করা হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
| বিষয় | বর্তমান অবস্থা | প্রস্তাবিত লক্ষ্য |
|---|---|---|
| ব্যবসা শুরু করার সময় | প্রায় এক বছর পর্যন্ত সময় লাগে | ১৪ দিনের মধ্যে সম্পন্ন |
| কোম্পানি নিবন্ধন প্রক্রিয়া | একাধিক ধাপে বিভক্ত ও জটিল | সমন্বিত ও দ্রুত অনলাইন ব্যবস্থা |
| যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ঋণপত্র | অনুমোদনে বিলম্ব ঘটে | কোম্পানি গঠনের ১৫তম দিনের মধ্যে |
| প্রশাসনিক সমন্বয় | বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত | একীভূত ও কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা |
| দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক কাঠামো | সীমিত সমন্বয় বিদ্যমান | নতুন সমন্বয় সেল কার্যকর করা |
এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের বিনিয়োগ পরিবেশে গতি আসবে এবং স্থানীয় ও বিদেশি উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যবসা শুরু করা অনেক বেশি সহজ ও কার্যকর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মন্তব্য