থাইল্যান্ডের বিমা খাতে আধুনিকায়ন: কনসার্ট ও ইভেন্ট কেন্দ্রিক ‘এমবেডেড ইন্স্যুরেন্স’ মডেল

থাইল্যান্ডের সাধারণ বিমা (Non-life insurance) খাত বর্তমানে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের গ্রাহকদের বিমা সেবার আওতায় আনতে প্রথাগত বিপণন পদ্ধতির পরিবর্তে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ওপর গুরুত্বারোপ করছে কোম্পানিগুলো। এই ডিজিটাল রূপান্তরের অগ্রভাগে রয়েছে থাই সেতাকিজ ইন্স্যুরেন্স পাবলিক কোম্পানি লিমিটেড (Thai Setakij Insurance)। কোম্পানিটি গতানুগতিক বিমা মডেলের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ‘এমবেডেড ইন্স্যুরেন্স’ (Embedded Insurance) বা সমন্বিত বিমা ব্যবস্থাকে তাদের প্রবৃদ্ধির মূল হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেছে।


এমবেডেড ইন্স্যুরেন্স: সহজলভ্যতা ও প্রয়োগ কৌশল

থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ‘এশিয়ান ব্যাংকিং অ্যান্ড ফিন্যান্স অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স এশিয়া সামিট’-এ এক বিশেষ আলোচনায় থাই সেতাকিজ ইন্স্যুরেন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বেন আসানাসেন এমবেডেড ইন্স্যুরেন্সের প্রায়োগিক দিক তুলে ধরেন। তাঁর মতে, এমবেডেড ইন্স্যুরেন্স মানে কেবল পেমেন্ট পেজে একটি বিমা অপশন যুক্ত করা নয়; বরং এটি হতে হবে গ্রাহকের মূল ক্রয়ের একটি পরিপূরক অংশ।

আসানাসেন উল্লেখ করেন, “বিমা পণ্যটিকে অবশ্যই গ্রাহকের প্রাথমিক ক্রয়ের সাথে খাপ খেতে হবে এবং ক্রয়প্রক্রিয়া হতে হবে অত্যন্ত সহজ। একে অংশীদার প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় প্রক্রিয়ার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকতে হবে।” এই কৌশলগত অবস্থানের কারণে থাই সেতাকিজ এখন কেবল সাধারণ ভ্রমণ বিমার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে কনসার্ট, ম্যারাথন এবং বিভিন্ন সামাজিক ইভেন্টের টিকিটের সাথে বিমা সুবিধা প্রদান করছে।


কনসার্ট ও ইভেন্ট টিকিটে নতুন সম্ভাবনা

থাইল্যান্ডে বর্তমানে লাইভ কনসার্ট এবং বিনোদনমূলক ইভেন্টের বাজার অত্যন্ত শক্তিশালী। থাই টিকিট মেজরের (Thai Ticket Major) মতো প্রভাবশালী টিকিটিং প্ল্যাটফর্মগুলোর সাথে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে কোম্পানিটি এখন ‘টিকিট রিফান্ড ইন্স্যুরেন্স’ অফার করছে।

এই বিমা সুবিধার মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ:

  • ক্ষতিপূরণ: কোনো গ্রাহক যদি শারীরিক অসুস্থতা, আকস্মিক দুর্ঘটনা কিংবা জরুরি দাপ্তরিক কাজের কারণে ইভেন্টে উপস্থিত হতে না পারেন, তবে বিমা কোম্পানি তাঁর টিকিটের মূল্য ফেরত দেয়।

  • বিপুল সক্ষমতা: আসানাসেন জানান, বড় বড় আন্তর্জাতিক কনসার্টের সময় বিমা বিক্রির চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এই চাহিদা মেটাতে তাদের ডিজিটাল সিস্টেম এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যা মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে প্রায় ৫০,০০০ ইলেকট্রনিক পলিসি ইস্যু করতে সক্ষম।


থাইল্যান্ডের ডিজিটাল অবকাঠামো ও বিমা বাজারের চিত্র

বিমা খাতের এই ডিজিটাল বিপ্লব মূলত থাইল্যান্ডের শক্তিশালী ইন্টারনেট সংযোগ ও মোবাইল ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। ‘ডেটারিপোর্টাল ডিজিটাল ২০২৬ থাইল্যান্ড’ এবং মিলিম্যান-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিচে তুলে ধরা হলো:

  • ইন্টারনেট সংযোগ: ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ থাইল্যান্ডে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর হার ছিল ৯৪.৭% (প্রায় ৬ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ)।

  • মোবাইল ব্যবহার: সক্রিয় সেলুলার সংযোগের সংখ্যা ৯ কোটি ৬৬ লাখ ছাড়িয়েছে।

  • প্ল্যাটফর্মের জনপ্রিয়তা: মেসেজিং অ্যাপ ‘লাইন’ (LINE)-এর মাসিক সক্রিয় ব্যবহারকারী ৫ কোটি ৬০ লাখের বেশি, যা বিমা বিপণনের একটি শক্তিশালী চ্যানেলে পরিণত হয়েছে।

  • বাজার প্রবৃদ্ধি: ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে থাইল্যান্ডের নন-লাইফ বিমা খাতের প্রিমিয়াম ৩% বৃদ্ধি পেয়ে ১৪৫.৭ বিলিয়ন থাই বাটে (৪.৫২ বিলিয়ন ডলার) পৌঁছেছে। এর মধ্যে স্বাস্থ্য বিমা খাতের প্রবৃদ্ধি সর্বোচ্চ ২৪%।


মূল্য নির্ধারণ ও দীর্ঘমেয়াদী গ্রাহক সংগ্রহের কৌশল

এমবেডেড ইন্স্যুরেন্সের ক্ষেত্রে বিমার প্রিমিয়াম বা কিস্তির হার নির্ধারণ করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আসানাসেন জানান, প্রিমিয়ামের হার মূল টিকিটের দামের ৩% থেকে ৫%-এর মধ্যে থাকলে গ্রাহকরা স্বাচ্ছন্দ্যে তা গ্রহণ করেন। এই হার ১০% অতিক্রম করলে গ্রাহকদের মধ্যে বিমুখতা তৈরি হয়।

যদিও প্রতিটি পলিসি থেকে প্রাপ্ত প্রিমিয়ামের পরিমাণ তুলনামূলক কম, তবে এর মূল সার্থকতা হলো নতুন গ্রাহক সংগ্রহ করা। এই প্রক্রিয়ায় মূলত তরুণ গ্রাহকদের একটি বিশাল ডাটাবেজ তৈরি হয়। আসানাসেন মনে করেন, একবার এই ব্যবস্থার মাধ্যমে কোনো তরুণকে বিমার আওতায় আনা গেলে ভবিষ্যতে তাকে ব্যক্তিগত দুর্ঘটনা, মোটর বিমা, আবাসন কিংবা অগ্নি বিমার মতো বড় অংকের প্রিমিয়ামের পণ্যে ক্রস-সেলিং করা সহজ হয়।


অংশীদারিত্ব, ডাটা শেয়ারিং ও ডিজিটাল ব্যাংকিং

এই মডেলের সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করে অংশীদার প্রতিষ্ঠানের সাথে তথ্যের আদান-প্রদান এবং সম্পর্কের ওপর। থাই সেতাকিজ প্রতিটি পলিসি বিক্রির সময় গ্রাহকের ইমেলসহ মৌলিক তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করে। তবে কিছু অংশীদার সরাসরি তথ্য শেয়ার না করে নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বিমা কোম্পানির সুবিধাগুলো পৌঁছে দেয়।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা প্রসঙ্গে আসানাসেন বলেন, থাইল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (Bank of Thailand) সাম্প্রতিক ভার্চুয়াল ব্যাংক স্থাপনের উদ্যোগ বিমা খাতের ডিজিটাল বিতরণ ব্যবস্থাকে আরও বেগবান করবে। ডিজিটাল ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে বিমা সেবা প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া আরও সহজ হবে।

থাইল্যান্ডের বিমা কোম্পানিগুলো এখন কেবল প্রথাগত এজেন্সির ওপর নির্ভর না করে আধুনিক ও উদ্ভাবনী ডিজিটাল বিপণন কৌশলের দিকে এগোচ্ছে। কনসার্ট ও ইভেন্টগামী তরুণ দর্শকদের এই বিমা সেবার আওতায় আনা কেবল একটি তাৎক্ষণিক ব্যবসায়িক সাফল্য নয়, বরং এটি ভবিষ্যতের একটি সচেতন বিমা-গ্রাহক সমাজ তৈরির সুদূরপ্রসারী কৌশল। ডিজিটাল সক্ষমতা এবং গ্রাহকের প্রয়োজনকে প্রাধান্য দিয়ে থাইল্যান্ডের বিমা খাত বিশ্ব বাজারে এক নতুন মানদণ্ড স্থাপন করছে।