সরকারি ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এসেনসিয়াল ড্রাগস্ কোম্পানি লিমিটেডের (ইডিসিএল) নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে আ কা মো. আশরাফুজ্জামানকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। তবে বিদ্যমান আইন, বিধিমালা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রবিধান উপেক্ষা করে পরিচালনা পর্ষদের (বোর্ড) কোনো প্রকার অনুমোদন ছাড়াই এই গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ সম্পন্ন করায় স্বাস্থ্য প্রশাসনের অভ্যন্তরে ব্যাপক বিতর্ক ও তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এটি নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, এই কৌশলগত ও নীতিগত নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের আইনগত ছাড়পত্র বা আনুষ্ঠানিক সম্মতি গ্রহণ করা হয়নি।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা সরকারি প্রজ্ঞাপনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ১৯৯৪ সালের কোম্পানি আইনের অধীনে এসেনসিয়াল ড্রাগস্ কোম্পানি লিমিটেডের ‘মেমোরেন্ডাম অ্যান্ড আর্টিক্যালস অব অ্যাসোসিয়েশন’-এর ৫৪(৩) ধারার আইনি বিধান অনুযায়ী আ কা মো. আশরাফুজ্জামানকে এই পদে মনোনীত করা হয়েছে। এই রাষ্ট্রীয় আদেশের শর্তানুযায়ী, নবনিযুক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালককে তার দায়িত্বভার গ্রহণের পূর্বে অন্য যেকোনো পেশা, ব্যবসা কিংবা সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত সমস্ত কর্ম-সম্পর্ক আনুষ্ঠানিক ও আইনগতভাবে পরিত্যাগ করতে হবে। এই শর্ত মেনে তিনি যোগদানের তারিখ থেকে পরবর্তী ১ বছর মেয়াদে এসেনসিয়াল ড্রাগসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে চুক্তিভিত্তিক দায়িত্ব পালন করবেন।
প্রক্রিয়াগত অসঙ্গতি ও সরকারি কর্মকর্তাদের প্রতিক্রিয়া
প্রজ্ঞাপনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, জনস্বার্থে এই প্রশাসনিক নির্দেশনা জারি করা হয়েছে এবং এই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের অন্যান্য বিস্তারিত শর্তাবলি একটি পৃথক দ্বিপাক্ষিক চুক্তিপত্র দ্বারা নির্ধারিত হবে। সরকারি আদেশ জারির পরপরই নবনিযুক্ত এমডি আ কা মো. আশরাফুজ্জামান রাষ্ট্রায়ত্ত এই ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ঢাকা কার্যালয়ে তার আনুষ্ঠানিক যোগদানপত্র জমা দিয়ে কার্যভার গ্রহণ করেছেন। তবে এই নির্বাহী আদেশ জারি, প্রকাশনা এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে একাধিক গুরুতর প্রশাসনিক অসঙ্গতি দৃশ্যমান হয়েছে:
ওয়েবসাইটের তথ্যগত অমিল: নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালকের এই গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন বা বিজ্ঞপ্তিটি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অফিশিয়াল পাবলিক ডাটাবেজ কিংবা ওয়েবসাইটে খুঁজে পাওয়া যায়নি।
মন্ত্রীর মন্তব্য অস্বীকৃতি: নিয়োগের এই প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা চাওয়ার জন্য গণমাধ্যমকর্মীরা যোগাযোগ করলে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এই বিষয়ে কোনো প্রকার মন্তব্য বা ব্যাখ্যা দিতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানান।
পরিচালনা পর্ষদকে উপেক্ষা: ইডিসিএলের পরিচালনা পর্ষদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এবং পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) ডা. আশরাফী আহমদ আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন যে, এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোম্পানির মূল পরিচালনা পর্ষদকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে।

তবে ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদের যোগ্যতা হিসেবে বিভিন্ন শিল্প/সংস্থা/প্রতিষ্ঠানে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, আর্থিক ও প্রশাসনিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার উপর ন্যূনতম ২০ (বিশ) বছরের অভিজ্ঞতা যার মধ্যে মৌলিক পর্যায়ের ব্যবস্থাপক পদে (Key Managerial Position) কমপক্ষে ০৫ (পাঁচ) বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। তার কোনোটাই তার নেই বলে অভিযোগ উঠেছে।
ডা. আশরাফী আহমদ স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, ইডিসিএলের সর্বশেষ বোর্ড সভায় নতুন এমডি নিয়োগ সংক্রান্ত কোনো এজেন্ডা বা আলোচ্য বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল না। ফলে এই নিয়োগের ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন বা সমর্থনের প্রশ্নই আসে না।
প্রাতিষ্ঠানিক বিধিমালা এবং নীতি নির্ধারকদের বিদেশ সফর
স্বাস্থ্য খাতের জ্যেষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত আইনি ও প্রথাগত কার্যপ্রণালী অনুসরণ না করায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিদ্যমান নীতিগত কাঠামো অনুযায়ী, ইডিসিএলের মতো একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ করতে হলে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত সাত সদস্যের বিশেষায়িত পরিচালনা পর্ষদের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত ও অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। পরিচালনা পর্ষদের আনুষ্ঠানিক মূল্যায়ন ও ভোটের পর সেই সংক্রান্ত একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সেই প্রস্তাবের ভিত্তিতে প্রজ্ঞাপন জারি করে।
বাস্তব ক্ষেত্রে, এই সাম্প্রতিক নিয়োগটি এমন একটি সংবেদনশীল সময়ে কার্যকর করা হয়েছে যখন দেশের স্বাস্থ্য খাতের শীর্ষ নীতি-নির্ধারক ও ইডিসিএল বোর্ডের অন্যতম প্রধান সদস্যরা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। পদাধিকারবলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন ইডিসিএল বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকলেও, বোর্ডের আরও দুজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিচালক—স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত এবং স্বাস্থ্য সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী বর্তমানে একটি সরকারি সফরে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অবস্থান করছেন। সরকারি সূচি অনুযায়ী আগামী ১ জুন তাদের দেশে ফেরার কথা রয়েছে।
[স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়া] বোর্ড মূল্যায়ন ও সিদ্ধান্ত ➔ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব ➔ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন
[অনুসৃত ব্যতিক্রমী প্রক্রিয়া] প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনা ➔ প্রজ্ঞাপন জারি ➔ পরিচালনা পর্ষদকে অবহিতকরণ ব্যতিরেকেই যোগদান
কার্যালয়ে অস্থিরতা ও পটভূমির বিবরণ
ইডিসিএলের এই আকস্মিক প্রশাসনিক রদবদলটি প্রতিষ্ঠানটির ঢাকা কার্যালয়ে ঘটে যাওয়া চরম অস্থিরতা ও নাটকীয় পরিস্থিতির ধারাবাহিকতায় সংঘটিত হয়েছে। এই নতুন নির্দেশনার পূর্বে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন মো. সামাদ মৃধা, যাকে ২০২৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ইডিসিএলের এমডি হিসেবে নিয়োগ প্রদান করেছিল। সামাদ মৃধার নিয়োগের ক্ষেত্রে সমস্ত আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রোটোকল কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল, যা ইডিসিএলের ১৮৫তম বোর্ড সভার সরাসরি অনুমোদন এবং কোম্পানির মেমোরেন্ডাম অ্যান্ড আর্টিক্যালস অব অ্যাসোসিয়েশনের ৫৩(৩) অনুচ্ছেদের আইনগত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।
| ব্যবস্থাপনা পরিচালক | নিয়োগের তারিখ | পরিচালনা পর্ষদের (বোর্ড) ভূমিকা | প্রজ্ঞাপনে উল্লেখিত আইনি ধারা |
| মো. সামাদ মৃধা | ৩০ ডিসেম্বর ২০২৪ | ১৮৫তম বোর্ড সভায় সম্পূর্ণ অনুমোদিত | আর্টিক্যালস অব অ্যাসোসিয়েশনের ৫৩(৩) ধারা |
| আ কা মো. আশরাফুজ্জামান | বর্তমান মেয়াদ | বোর্ড সভা বা এজেন্ডা ছাড়াই সরাসরি নিয়োগ | আর্টিক্যালস অব অ্যাসোসিয়েশনের ৫৪(৩) ধারা |
ক্ষমতা ও দায়িত্ব হস্তান্তরের এই প্রক্রিয়াটি ইডিসিএলের ঢাকা কার্যালয়ে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা ও উত্তেজনার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়। নিয়োগের দিন সকালবেলা একদল বহিরাগত ব্যক্তি আকস্মিকভাবে ইডিসিএলের করপোরেট সদর দপ্তরে প্রবেশ করে এবং তৎকালীন এমডি সামাদ মৃধাসহ বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন সংস্থাপনিক কর্মকর্তাকে তাদের নিজ নিজ কক্ষের ভেতরে অবরুদ্ধ করে রাখে। পরবর্তীতে খবর পেয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন এবং অবরুদ্ধ কর্মকর্তাদের উদ্ধার করেন। এরপর পুলিশের বিশেষ পাহারায় তৎকালীন এমডিসহ অন্যান্য কর্মকর্তাদের কার্যালয় থেকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।
এই দ্রুত ও ব্যতিক্রমী নিয়োগের আইনি এবং প্রক্রিয়াগত ভিত্তি সম্পর্কে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একাধিক উচ্চপদস্থ সচিবালয় কর্মকর্তা নিশ্চিত করেন যে, মন্ত্রণালয়টি মূলত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব ও সরাসরি নির্দেশনার ভিত্তিতেই এই প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। প্রশাসনিক কর্মকর্তারা আরও উল্লেখ করেন যে, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, বোর্ডের এজেন্ডা বা সেখানে কী ঘটেছে—সে সম্পর্কে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কোনো পূর্বানুমান বা নিজস্ব এক্তিয়ার ছিল না।
