বেকারত্ব সংকট ও বাংলাদেশের যুবসমাজের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান রূপরেখা

কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যকার ভারসাম্যহীনতা আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম প্রধান সংকট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান কর্তৃক আলোচিত এই বিষয়টি স্পষ্ট করে যে, বেকারত্ব কেবল একটি অর্থনৈতিক সূচক বা পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি মানুষের অস্তিত্ব, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয়ের এক গভীরতম রূপ। যুগ যুগ ধরে বিশ্বসাহিত্যে ও সমকালীন সমাজবিদ্যায় কর্মহীনতার এই মানবিক সংকট নানাভাবে উপস্থাপিত হয়েছে, যা বর্তমান সময়েও প্রাসঙ্গিক।

বেকারত্বের মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক প্রভাব

ইতিহাস এবং সাহিত্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কর্মহীনতা মানুষকে সমাজ ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে এক ধরনের জীবন্ত লাশে পরিণত করে। ১৯৬২ সালে নোবেলজয়ী আমেরিকান লেখক জন স্টেইনবেক তাঁর ১৯৩৯ সালে প্রকাশিত ‘দ্য গ্রেপস অব র‍্যাথ’ উপন্যাসে ১৯৩০-এর দশকের মহামন্দার পটভূমিতে কর্মহীন মানুষের যাযাবর জীবন ও তীব্র ক্ষোভের চিত্র এঁকেছেন। একইভাবে ভিক্টোরিয়া যুগের ইংল্যান্ডের দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থানের অভাব ফুটে উঠেছে চার্লস ডিকেন্সের ‘অলিভার টুইস্ট’ ও ‘ডেভিড কপারফিল্ড’ উপন্যাসে। ফ্রাঞ্জ কাফকার ‘দ্য মেটামরফোসিস’ কিংবা আলবেয়ার কামুর ‘দ্য স্ট্রেন্জার’ উপন্যাসে কর্মহীন মানুষের যে চরম একাকীত্ব ও বিচ্ছিন্নতাবোধ দেখানো হয়েছে, তা মূলত বেকারত্বেরই মনস্তাত্ত্বিক রূপ।

বাংলা সাহিত্যেও এর নগ্ন বাস্তবতা প্রতিফলিত হয়েছে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ ও ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’য় অর্থনৈতিক সংকট ও কর্মহীনতার চিত্র স্পষ্ট। দেশভাগ-পরবর্তী কলকাতার বেকার যুবকদের হতাশা ও ক্ষোভের দলিল হিসেবে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ এবং সমরেশ মজুমদারের ‘উত্তরাধিকার’ ও ‘কালবেলা’ উপন্যাস বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যেখানে বেকারত্ব যুবসমাজকে চরম শূন্যতা ও বিদ্রোহের দিকে ঠেলে দেয়। চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’, ‘সীমাবদ্ধ’ ও ‘জনঅরণ্য’ এবং ঋত্বিক ঘটকের ‘মেঘে ঢাকা তারা’ চলচ্চিত্রে চাকরিপ্রার্থী যুবকদের ইন্টারভিউ বোর্ডের অপমান, নৈতিক স্খলন এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের ভাঙনের চিত্র কালজয়ী হয়ে আছে।

বাংলাদেশের বর্তমান বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান

বর্তমান বাংলাদেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির তুলনায় কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি অত্যন্ত ধীর। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ প্রবেশ করলেও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে মাত্র ৮৭ লাখের। ফলে প্রায় ৫০ লাখ তরুণ স্থায়ীভাবে কর্মহীন থেকে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে করোনা মহামারী এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বহু মানুষ চাকরি হারিয়েছেন।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং ‘স্ট্যাটিস্টা’-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে সামগ্রিক বেকারত্বের হার ৪.৪৮ শতাংশ। তবে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ১২.৪ শতাংশ। উচ্চশিক্ষিত অর্থাৎ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী বেকারের সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। দক্ষতার অমিল বা ‘স্কিল মিসম্যাচ’-এর কারণে এক-তৃতীয়াংশ গ্র্যাজুয়েট পাস করার পর ৩ থেকে ৪ বছর পর্যন্ত বেকার থাকেন। এর ফলে সম্প্রতি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়িয়ে ৩২ বছর করা হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দেশের যুবশক্তির ১৯.৫৪ শতাংশ বা প্রায় ৫৫ লাখ তরুণ বর্তমানে অর্থনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় বা ‘নিট’ (NEET: Not in Education, Employment or Training) তালিকাভুক্ত, যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

কাঠামোগত ত্রুটি ও দ্বিমুখী সংকট

বাংলাদেশের চাকরি বাজারে শিক্ষিত ও যোগ্য হওয়াই নিয়োগের একমাত্র শর্ত হিসেবে গণ্য হচ্ছে না। পুরো প্রক্রিয়াটি স্বজনপ্রীতি, রেফারেন্স সংস্কৃতি, কোটা প্রথা, দুর্নীতি, রাজনৈতিক পক্ষপাত এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো অস্বচ্ছতার কারণে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে মেধা তালিকার শীর্ষে থেকেও অনেক যোগ্য প্রার্থী বঞ্চিত হচ্ছেন।

এর পাশাপাশি একটি দ্বিমুখী সংকট বিদ্যমান। একদিকে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার সাথে কর্পোরেট বা শিল্প খাতের চাহিদাকৃত দক্ষতার কোনো মিল নেই। বাস্তবভিত্তিক প্রায়োগিক জ্ঞান, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং যোগাযোগ দক্ষতার অভাবে নিয়োগকর্তারা যোগ্য প্রার্থী খুঁজে পাচ্ছেন না, আবার সর্বোচ্চ সিজিপিএ ধারী প্রার্থীরাও বেকার থাকছেন। কর্মসংস্থান না বাড়িয়ে শিক্ষার সনদ বিতরণ করার ফলে অর্থনীতিতে ‘এলিট আনএমপ্লয়মেন্ট’ বা উচ্চমানের বেকারত্ব তৈরি হচ্ছে, যেখানে অতি-দক্ষ তরুণরা যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ না পেয়ে নিচু পদের চাকরি (Underemployment) করতে বাধ্য হচ্ছে।

দেশের বৈদেশিক আয়ের অন্যতম উৎস রেমিট্যান্স মূলত কম শিক্ষিত ও আধা-দক্ষ শ্রমিকদের কায়িক শ্রমের মাধ্যমে অর্জিত হচ্ছে। পক্ষান্তরে, উচ্চ ডিগ্রিধারীরা বিদেশে পাড়ি জমিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করায় দেশ দীর্ঘমেয়াদে মেধা পাচার ও সম্পদ পাচারের সম্মুখীন হচ্ছে।

স্থানান্তরিত ক্রোধ ও সামাজিক অস্থিরতা

ফরাসি তাত্ত্বিক ফ্রান্তজ ফ্যানন তাঁর ১৯৫২ সালের ‘ব্ল্যাক স্কিন, হোয়াইট মাস্ক’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, দীর্ঘদিনের অবদমন ও অসম্মান সমাজে হিংসা বাড়িয়ে দেয়। মানুষ যখন তার সংকটের মূল কারণ খুঁজে পায় না, তখন সে চারপাশের নিরীহ ও দুর্বল মাধ্যমের ওপর আক্রোশ প্রকাশ করে, যাকে মনস্তত্ত্বের ভাষায় ‘স্থানান্তরিত ক্রোধ’ (Transferred Aggression) বলা হয়। বাংলাদেশে চলমান সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা, ভাঙচুর এবং বিভিন্ন ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক উপাসনালয়ে হামলার পেছনে এই বেকারত্বজনিত ক্ষোভ ও তার রাজনৈতিক অপব্যবহার একটি অন্যতম কারণ হিসেবে কাজ করছে। কর্মহীনতার সামাজিক নিগ্রহ সহ্য করতে না পেরে অনেক মেধাবী তরুণ আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন অথবা অবৈধ উপায়ে সমুদ্রপথে বিদেশ যাত্রার মতো ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

উত্তরণের উপায়: অনন্যোপায় উদ্যোক্তা ও কারিগরি শিক্ষা

বর্তমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সরকারি বা বেসরকারি খাতে রাতারাতি ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা প্রায় অসম্ভব। এই পরিস্থিতিতে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক রবার্ট ফেয়ারলি-র তত্ত্ব অনুযায়ী, তরুণদের ‘অনন্যোপায় উদ্যোক্তা’ বা বাধ্যগত উদ্যোক্তা (Necessity Entrepreneurship) হিসেবে আত্মকর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। নিরাপদ চাকরির অভাবই এখানে উদ্যোক্তা হওয়ার মূল চালিকাশক্তি।

বিদেশে কাজ করার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন অনেকে দেশে ফিরে পশুপালন, মৎস্য খামার, ফল চাষ কিংবা রেস্তোরাঁ ব্যবসার মাধ্যমে সফল হচ্ছেন। তবে ক্ষুদ্র পর্যায়ের আত্মকর্মসংস্থান সাময়িক সমাধান দিলেও ব্যাপক বেকারত্ব দূরীকরণে বড় মাপের শিল্পায়নের কোনো বিকল্প নেই। যেহেতু সবাই উদ্যোক্তা হওয়ার গুণাবলী নিয়ে জন্মায় না, তাই বেকারদের দুটি ভাগে ভাগ করে প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি: ১. একটি অংশকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা। ২. অবশিষ্ট বড় অংশকে দক্ষ শ্রমিক হিসেবে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ প্রদান করা।

বর্তমানে বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষার প্রসার ঘটলেও এর গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, যার কারণে কারিগরি শিক্ষা নিয়েও অনেকে বেকার থাকছেন। আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী মানসম্মত কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে একদিকে যেমন রেমিট্যান্সের প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরেও বেকারত্ব সংকটের টেকসই সমাধান সম্ভব হবে।

লেখকঃ ড. মীজানুর রহমান

অধ্যাপক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়