মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজারে একটি ঐতিহাসিক ও অভূতপূর্ব অভিষেকের মধ্য দিয়ে ২ ট্রিলিয়ন (২ লাখ কোটি) মার্কিন ডলারের বেশি বাজারমূল্য অর্জন করেছে ইলন মাস্কের মালিকানাধীন শীর্ষস্থানীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা স্পেসএক্স (SpaceX)। আর এই রেকর্ড সৃষ্টিকারী লিস্টিং বা তালিকাভুক্তির হাত ধরে স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইলন মাস্ক আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বের সর্বপ্রথম ‘ট্রিলিয়নিয়ার’ (১ লাখ কোটি ডলারের বেশি সমপরিমাণ নিট সম্পদের মালিক) হিসেবে মানব ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম লিপিবদ্ধ করলেন।
আজ শুক্রবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান শেয়ারবাজার নাসডাক (NASDAQ) এক্সচেঞ্জে স্পেসএক্সের শেয়ারের আনুষ্ঠানিক লেনদেন শুরু হয়। লেনদেনের শুরুতেই প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও (IPO) মূল্যের চেয়ে প্রায় ৬ দশমিক ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে স্পেসএক্সের প্রতি শেয়ারের বাজারদর দাঁড়ায় ১৫০ ডলারে। এর ফলে সামগ্রিকভাবে অ্যারোস্পেস কোম্পানিটির মোট বাজারমূল্য এসে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৯৬ ট্রিলিয়ন ডলারে, যা স্পেসএক্সকে বর্তমান বাজারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ষষ্ঠ বৃহত্তম পাবলিক কোম্পানিতে পরিণত করার সুনির্দিষ্ট ট্র্যাকে নিয়ে গেছে।
ঐতিহাসিক লেনদেনের সূচনা ও পুঁজিবাজারের চিত্র
কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার বিশেষ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, নিউইয়র্ক সময় সকাল সাড়ে ৯টায় নাসডাক মার্কেটসাইটে ঐতিহ্যবাহী ঘণ্টা বাজিয়ে স্পেসএক্সের প্রেসিডেন্ট গুইন শটওয়েল এবং কোম্পানির প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) ব্রেট জনসেন এই ঐতিহাসিক শেয়ার লেনদেনের আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার এই প্রক্রিয়াটি বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
আইপিওর মাধ্যমে মহাকাশ গবেষণা কোম্পানিটি মোট ৭ হাজার ৫০০ কোটি (৭৫ বিলিয়ন) মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ শেয়ার বিক্রি করে, যা বাজারে ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই এর সামগ্রিক প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যমানকে ১ দশমিক ৭৭ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে সক্ষম হয়। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, স্পেসএক্সের এই আইপিওতে সাধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে প্রত্যাশার চেয়ে চার গুণ বেশি আবেদন জমা পড়েছিল, যা কোম্পানিটির প্রতি বাজারের আকাশচুম্বী চাহিদার প্রতিফলন ঘটায়।
প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ ও বৈশ্বিক সার্বভৌম তহবিল
ব্লুমবার্গ নিউজের নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুযায়ী, স্পেসএক্সের আইপিওতে বরাদ্দ করা মোট প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের সিংহভাগই গেছে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় তহবিলের নিয়ন্ত্রণে। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, বরাদ্দের প্রায় ৭০ শতাংশ শেয়ারই গেছে লং অনলি ইনভেস্টমেন্ট (দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই প্রবৃদ্ধির আশায় সম্পদ ধরে রাখার বিশেষ আর্থিক কৌশল) তহবিল এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশ সৌদি আরব ও কুয়েতের মতো প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর সরকারি সার্বভৌম তহবিল বা সোভেরেন ওয়েলথ ফান্ডের (Sovereign Wealth Fund) পকেটে।
বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার হওয়ার এই গৌরব অর্জনের মধ্য দিয়ে ইলন মাস্কের ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাল। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, স্পেসএক্সের এই অভূতপূর্ব বাজার প্রবৃদ্ধি এবং নাসডাকে এর সফল অভিষেক আগামী দিনে বাণিজ্যিক মহাকাশ অভিযানের পরিধি ও উপগ্রহ যোগাযোগ প্রযুক্তির বৈশ্বিক বাজারকে আরও গতিশীল করে তুলবে। একই সাথে বিপুল পরিমাণ প্রাতিষ্ঠানিক ও রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের এই সমাগম প্রমাণ করে যে, দীর্ঘমেয়াদী টেকসই ও কৌশলগত প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে স্পেসএক্স এখন বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে।
