খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ই জানুয়ারি ২০২৬, ৬:৫৬ এএম

বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই (FDI) উৎসাহিত করতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক অনন্য ও যুগান্তকারী সুযোগ তৈরি করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এখন থেকে কোনো প্রবাসী যদি তাঁর প্রচেষ্টায় দেশে বড় অংকের বিদেশি বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে পারেন, তবে সরকার তাঁকে নির্দিষ্ট হারে নগদ প্রণোদনা প্রদান করবে। সোমবার (২৬ জানুয়ারি, ২০২৬) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) গভর্নিং বোর্ডের সভায় এই বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।
Table of Contents
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন সংবাদ ব্রিফিংয়ে জানান, প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তাঁদেরকে কেবল রেমিট্যান্স প্রেরক নয়, বরং ‘বিনিয়োগ দূত’ হিসেবে স্বীকৃতি দিতেই এই পদক্ষেপ। অনুমোদিত প্রস্তাব অনুযায়ী, কোনো প্রবাসী যদি দেশে সরাসরি ইকুইটি বিনিয়োগ আনতে সফল হন, তবে সেই বিনিয়োগের ওপর ১.২৫ শতাংশ হারে নগদ প্রণোদনা পাবেন। এই উদ্যোগটি প্রবাসীদের বিশাল বৈশ্বিক নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে দেশের শিল্প ও ব্যবসা খাতে নতুন মূলধন জোগাড়ের অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রবাসীদের জন্য প্রণোদনা ও বিডার সংস্কার পরিকল্পনার সারণি:
| বিষয়ের বিবরণ | বিস্তারিত তথ্য ও হার |
| প্রণোদনার হার | মোট বিনিয়োগের ১.২৫ শতাংশ |
| বিনিয়োগের ধরণ | প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (FDI/Equity) |
| লক্ষ্যমাত্রা | শিল্পায়ন ও বাণিজ্যিক মূলধন বৃদ্ধি |
| বিদেশের প্রথম অফিস | চীন (এরপর দক্ষিণ কোরিয়া ও ইইউ) |
| নিয়োগ পদ্ধতি | কমিশন ভিত্তিক (সফলতার ওপর পারিশ্রমিক) |
| একীভূত সংস্থা | বিডা, বেজা, বেপজা সহ মোট ৬টি সংস্থা |
বিডার কার্যক্রমকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে বিদেশের মাটিতে অফিস খোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীনে বিডার কার্যালয় স্থাপন করা হবে। তবে প্রচলিত সরকারি নিয়োগ পদ্ধতির বাইরে গিয়ে এসব অফিসে জনবল নিয়োগ দেওয়া হবে পারফরম্যান্স বা কমিশন ভিত্তিতে। অর্থাৎ, বিনিয়োগ আনতে পারার সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করেই তাঁদের পারিশ্রমিক নির্ধারিত হবে। বিশেষ করে চীনের ক্ষেত্রে স্থানীয় অভিজ্ঞ নাগরিকদের নিয়োগে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, যাতে তাঁরা ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বাধা পেরিয়ে বড় বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করতে পারেন।
বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল যে, বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে গেলে বিভিন্ন সংস্থার কাছে দৌড়ঝাঁপ করতে হয়। এই ভোগান্তি কমাতে সরকার বিডা (BIDA), বেজা (BEZA), বেপজা (BEPZA), হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ, পিপিপি (PPP) এবং বিসিক (BSCIC)—এই ছয়টি সরকারি সংস্থাকে একীভূত করে একটি একক কাঠামোর আওতায় আনার রোডম্যাপ অনুমোদন করেছে। ‘সিঙ্গেল আমব্রেলা’ নামে পরিচিত এই ব্যবস্থার ফলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস পাবে এবং নিয়মিত বোর্ড সভার মাধ্যমে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। এই একীভূতকরণ প্রক্রিয়াটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য একটি স্বাধীন তৃতীয় পক্ষ বা আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হবে।
সভায় সরকারি সম্পদ বেসরকারিকরণ প্রক্রিয়ার জন্য একটি আনুষ্ঠানিক গাইডলাইনও অনুমোদন করা হয়েছে। ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের মাধ্যমে পেশাদার উপায়ে সরকারি অলাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেসরকারিকরণের পথ প্রশস্ত করা হবে। এর ফলে সরকারি সম্পদের অপচয় কমবে এবং বেসরকারি খাতের দক্ষ ব্যবস্থাপনায় শিল্পায়ন ত্বরান্বিত হবে।
সরকারের এই বহুমুখী ও আধুনিক পদক্ষেপগুলো বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশে বড় ধরণের গুণগত পরিবর্তন আনবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে প্রবাসীদের নগদ প্রণোদনা প্রদানের মাধ্যমে বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগটি একটি উদ্ভাবনী কৌশল, যা এশিয়ার অনেক দেশ অনুসরণ করে সাফল্য পেয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে এই সংস্কারগুলো দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়ক হবে।
মন্তব্য