বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও বাংলাদেশ: শুধু নিরপরাধ সাধারণ জনগণ ও নারীরাই কেন অবজ্ঞার শিকার?

— আতিকা নূরী —

গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যখন ক্ষমতা গ্রহণ করে, তখন সাধারণ মানুষের মনে যে প্রত্যাশার পারদ তৈরি হয়েছিল, তা ছিল এককথায় আকাশচুম্বী। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে জমে থাকা অপ্রাপ্তি, পাহাড়সম বৈষম্য আর প্রাতিষ্ঠানিক অন্যায়ের অবসান রাতারাতি হয়ে যাবে—বিক্ষুব্ধ জনতা হয়তো এমনটাই আশা করেছিল। এটা সত্য যে, এত অল্প সময়ে সব সংস্কার সম্ভব নয়। কিন্তু মানুষের এই সীমাহীন প্রত্যাশার বিপরীতে সরকার যদি অন্তত প্রাথমিক কিছু ক্ষেত্রে ন্যূনতম সুশাসন ও স্বস্তি নিশ্চিত করতে পারত, তবে আজ জনমনে এই তীব্র অনাস্থা ও হতাশার সৃষ্টি হতো না।

এর মধ্যে সবচেয়ে জরুরি যে ইস্যুটির কথা বলতেই হয়, তা হলো—আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি। যে কাঙ্ক্ষিত অভ্যুত্থানের পেছনে ছিল একটি বৈষম্যহীন, নিরাপদ ও আইনের শাসনে মোড়ানো বাংলাদেশের স্বপ্ন; যেখানে প্রশাসনিক সংস্কার হবে, মব জাস্টিস (গণপিটুনি) বন্ধ হবে, নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, এবং নিরপরাধ মানুষের ওপর হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা বা শারীরিক লাঞ্ছনা বন্ধ হবে—আজ সেই স্বপ্নের জমিনেই এক ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি আমরা।

অন্ধকারের উল্টো রথ ও ‘মব জাস্টিস’

আমরা ভেবেছিলাম এক নতুন, প্রগতিশীল ট্রেনের যাত্রী হবো। বিশেষ করে, অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে রাজনীতিসহ রাষ্ট্রের সর্বক্ষেত্রে নারীর ক্ষমতায়ন দেখার এক প্রবল উচ্চাকাঙ্ক্ষা জন্মেছিল আমাদের মনে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল এর উল্টো চিত্র। অভ্যুত্থানের পর থেকে দেশ যেন এক অদ্ভুত উল্টো পথে হাঁটা শুরু করল। কিছু উগ্র, চরমপন্থী ও কট্টর ডানপন্থী গোষ্ঠী নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। তারা সমাজে কঠোর অনুশাসন চাপিয়ে দিতে এবং প্রগতির পথ রুদ্ধ করে দেশকে এক অন্ধকার জগতে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এখনো পর্দার আড়ালে ও প্রকাশ্যে সক্রিয়।

সম্প্রতি মাদক নিয়ন্ত্রণের নামে যে ‘মব জাস্টিস’ বা গণ-আদালতের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তা চোখে পড়ার মতো। মাদকবিরোধী অবস্থানের পক্ষে আমরা সবাই, কিন্তু এর নামে বিচারহীনতার নতুন উৎসব কোনো সমাধান হতে পারে না; বরং এটি আইনের শাসনের জন্য এক বিরাট হুমকি। আজকাল কিছু নব্য উগ্রপন্থী ও অতি-উত্সাহী ব্যক্তি মাদকবিরোধী অভিযানের আড়ালে মানুষের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে।

প্রশ্ন জাগে—তাহলে কি দেশে আইন-আদালতের আর কোনো প্রয়োজন নেই? রাষ্ট্র কেন কোটি কোটি টাকা খরচ করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বা পুলিশ প্রশাসন পরিচালনা করছে? যেকোনো ব্যক্তিকে মাদক ব্যবসার বা বাড়িতে মাদক রাখার স্রেফ মিথ্যা অভিযোগে, কিছু উত্তেজিত লোক জড়ো করে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন করা কতটুকু যৌক্তিক? মায়ের সামনে সন্তানের হাত-চোখ বেঁধে নির্মমভাবে মারধরের ঘটনা কোন সভ্যতার ইঙ্গিত দেয়? প্রশাসন ও প্রচলিত বিচারব্যবস্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই সংস্কৃতি যদি বন্ধ না হয়, তবে মাদক তো নির্মূল হবেই না, বরং রাষ্ট্র এক চরম নৈরাজ্যের দিকে ধাবিত হবে।

ধর্ষণের ‘মহামারি’ ও বিচারহীনতার ক্রন্দন

এবার নারীদের বিষয়ে কিছু কথা না বললেই নয়। বর্তমান বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন, খুন এবং ধর্ষণ যেন এক সামাজিক মহামারির আকার ধারণ করেছে। রাষ্ট্রব্যাপী ছড়িয়ে পড়া এই পাশবিকতাকে ‘মহামারি’ বলতে গেলে ঠিক কতটা নৃশংসতা দেখতে হবে আমাদের? আমরা সমাজের যে স্তরেই বসবাস করি না কেন, আজ আমরা সবাই এই যৌন সহিংসতার আতঙ্কে সমানভাবে জর্জরিত, শঙ্কিত ও বিপর্যস্ত। ধর্ষণ নামের এই করাল ব্যাধিকে কি আদৌ কখনো লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হবে?

ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতা মোকাবিলায় প্রয়োজন কেবল আইনি ব্যবস্থা নয়, বরং একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ। সমাজের প্রতিটি স্তরে, পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমে এই বিষয়ে তুমুল আত্মোপলব্ধি ও তোলপাড় প্রয়োজন। সামাজিক সংবেদনশীলতা, সচেতনতা এবং আইন ও বিচারব্যবস্থার সম্মিলিত ও কঠোর অংশগ্রহণ ছাড়া এই ব্যাধি নির্মূল করা অসম্ভব। দুঃখের বিষয়, এই অপরাধী চক্র কেবল যৌন সহিংসতা করেই ক্ষান্ত হচ্ছে না; তারা ভুক্তভোগীকে হত্যা করছে এবং নৃশংসভাবে মৃতদেহ বিকৃত করছে। সভ্য সমাজ আজ বীভৎসতম কার্যকলাপের নীরব সাক্ষী। এই নরপশুদের হাত থেকে আজ শিশু, কিশোরী কিংবা বৃদ্ধা—কেউই নিরাপদ নয়।

এই লেখার অবতারণা মূলত রামিসা ও আছিয়াদের জন্য। মাগুরার আছিয়া যেমন নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছিল, রামিসার ভাগ্যও তার চেয়ে আলাদা হয়নি। সম্প্রতি রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে নয়নমনি নামের এক তরুণীর রহস্যজনক মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, যাকে পরিকল্পিতভাবে খুন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া—আজ বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে এমন হাজারো শিশু, কিশোরী, বয়োবৃদ্ধ কিংবা মানসিকভাবে অসুস্থ নারীর নির্মম নির্যাতন, খুন ও ধর্ষণের গল্প চাপা পড়ে আছে। পরিসংখ্যান বলছে, ঘটে যাওয়া অপরাধের চার ভাগের এক ভাগও গণমাধ্যমে প্রকাশ পায় না।

চারিদিকে এত হিংসা, অপরাধপ্রবণতা আর অস্থিরতা কেন মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে? কেন স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশে ক্রমাগত ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড ঘটেই চলেছে? বিচারের বাণী এখানে আক্ষরিক অর্থেই নিভৃতে কাঁদছে। নিজের কন্যাসন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে কেন পিতামাতাদের সর্বক্ষণ বুকভরা উৎকণ্ঠা নিয়ে দিন পার করতে হবে? কে দেবে এসব প্রশ্নের উত্তর? রাষ্ট্র, সরকার, সমাজ, নাকি সর্বশক্তিমান? উত্তর যদি জানা না থাকে, তবে শুধু এটুকু বলুন—আছিয়া ও রামিসার পর পরবর্তী শিকার কে? আমি, নাকি আপনার ঘরের পরের প্রজন্মের কন্যারা?

অপরাধের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সাফাই

সবচেয়ে ভীতিজনক বিষয় হলো, ধর্ষক ও খুনিদের পক্ষে যখন সমাজ বা ধর্মের নাম নিয়ে সাফাই গাওয়া হয়। যারা এই অপরাধীদের কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করে বা পরোক্ষভাবে মদদ দেয়, তাদের ভূমিকা অত্যন্ত নোংরা। উদাহরণস্বরূপ, তথাকথিত ধর্মীয় বক্তা এনায়েতুল্লাহ আব্বাসী নারীদের নিয়ে ঘটে যাওয়া প্রায় প্রতিটি সহিংসতার ঘটনায় এক ধরণের খোঁড়া যুক্তি বা ‘ভিকটিম ব্লেমিং’ (ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করা) করার চেষ্টা করেন। সাংবাদিক খালেদ মহিউদ্দিনের একটি বহুল আলোচিত টকশোতে তিনি মন্তব্য করেছিলেন—চারজন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য ও আসামির নিজস্ব স্বীকারোক্তি ছাড়া নাকি ধর্ষণ প্রমাণিত হয় না! সাথে তিনি এটাও জুড়ে দেন যে, দেশে শরিয়া আইন চালু হলে নারীরা আর ধর্ষিত হবে না। অপরাধের এমন প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ এবং ধর্মীয় অপব্যাখ্যা অপরাধীদের আরও বেশি পার পেয়ে যাওয়ার সাহস জোগায়।

এদিকে রাজনৈতিক অঙ্গনের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কোনো দৃশ্যমান বা ইতিবাচক পরিবর্তন এখনো সাধারণ মানুষের চোখে পড়েনি। অবশ্য এটি কোনো একক সরকারের ব্যর্থতা নয়; বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে একধরণের দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা ঐতিহাসিকভাবেই চলে আসছে। এই সময়ে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার পাশাপাশি শুরু হয় প্রতিশোধমূলক হিংসা, সংঘর্ষ ও ভাঙচুর, যা সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকাকে বিপন্ন করে তোলে। এর ফলে সমাজজুড়ে এক গভীর নিরাপত্তাহীনতা ও উদ্বেগের জন্ম হয়।

রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ: স্বপ্ন ও বাস্তবতার ব্যবধান

২০২৬ সালের নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থী মনোনয়নে নারীর অন্তর্ভুক্তির পরিসংখ্যান আমাদের ভীষণভাবে হতাশ করেছে। সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনি ট্রেনে নারী প্রার্থীর সংখ্যা ছিল যাতসামান্য, যা আঙুলে গোনা যায়। সংসদের প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসা ধর্মভিত্তিক দল জামায়াতে ইসলামীসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলে কোনো নারী প্রার্থীই ছিল না! সরাসরি ভোটে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে নারীদের প্রতি ন্যূনতম এই বৈষম্যটুকু দূর করতে পারেনি জামায়াতসহ দেশের প্রধান দলগুলো।

এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন ও সমতার অধিকারের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হওয়া একেবারেই স্বাভাবিক। আমরা জানি, বাংলাদেশের দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাসে নারীরা ছিল প্রেরণার ও বীরত্বের অপর নাম। রাজপথে স্বৈরাচারবিরোধী বা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নারীদের বলিষ্ঠ ও সম্মুখ উপস্থিতি থাকলেও, সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় বা নেতৃত্বের আসনে আমরা এখনো এক চরম ভারসাম্যহীনতা দেখছি।

একাধিক শিক্ষাবিদ, রাষ্ট্রচিন্তক ও নারী অধিকার কর্মীদের মতে, আজ একজন নারী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বা রাজনীতিতে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গেই তাকে নিয়ে শুরু হয় নোংরা ‘ট্রল’ ও চরিত্রহননের অপচেষ্টা। এই সামাজিক লাঞ্ছনার ভয়ে পরিবারগুলো পিছিয়ে যায়। তদুপরি, রাজনৈতিক দলগুলো থেকেও নারীরা সেই অভয় বা প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন পান না, যা তাদের সাহস জোগাবে। ফলস্বরূপ, যে নারীরা বুক চিতিয়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন সফল করল, দিনশেষে তারাই আজ সবচেয়ে বড় বৈষম্যের শিকার।

শেষ কথা

সমাজ, রাজনীতি এবং রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ কেবল ‘নারী অধিকার’ বা সমতা প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন নয়; বরং এটি একটি কার্যকর, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম পূর্বশর্ত।

  • প্রতিনিধিত্বের ন্যায্যতা: দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী। তাই সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় তাদের এই অনুপস্থিতি রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিকভাবে পঙ্গু করে রাখে।

  • নীতির গুণগত উন্নয়ন: বিশ্বজুড়ে গবেষণা ও বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, নীতিনির্ধারণে নারীদের অংশগ্রহণ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবারকল্যাণ, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার সংক্রান্ত আইনগুলোকে অনেক বেশি মানবিক ও বাস্তবসম্মত করে তোলে।

অতএব, নারীদের কেবল লোকদেখানো বা কোটার সুযোগ দেওয়া নয়; বরং শিক্ষা, রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার মাধ্যমে তাদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এই মুহূর্তে রাষ্ট্রের জন্য অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে একটি মানবিক বাংলাদেশ গড়তে না পারলে, আমাদের এই স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সাধারণ মানুষের কাছে অর্থহীন হয়েই থাকবে।

লেখক: নারী অধিকার কর্মী ও লেখক।