রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) উর্দু বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম, ফলাফল জালিয়াতি এবং মেধাক্রম পরিবর্তনের অভিযোগ উঠেছে। ভাইভা বোর্ডের সুপারিশ করা তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা যোগ্য প্রার্থীকে বাদ দিয়ে চতুর্থ স্থানে থাকা প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়ার তথ্য সম্প্রতি প্রকাশ্যে এসেছে। এই জালিয়াতির প্রতিবাদে নিয়োগ বোর্ডের বিশেষজ্ঞ সদস্য ফলাফল বিবরণীতে স্বাক্ষর না করলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন সিন্ডিকেট এই বিতর্কিত নিয়োগের চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়।
Table of Contents
নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রেক্ষাপট ও ঘটনার সূত্রপাত
বিভাগের শিক্ষক সংকট নিরসনে ২০২৩ সালের ৩০ এপ্রিল তিনটি স্থায়ী প্রভাষক পদের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এর আগে প্রকাশিত একটি বিজ্ঞপ্তি বাতিল হওয়ায় প্রশাসনিক নির্দেশনায় ভাইভা চলাকালে পদের সংখ্যা তিন থেকে বাড়িয়ে ছয়টি করার সিদ্ধান্ত নেয় নিয়োগ বোর্ড। সেই অনুযায়ী, গত বছরের ৭ আগস্ট অনুষ্ঠিত লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৪৩ জন প্রার্থীর মধ্যে ১৮ জনকে মৌখিক পরীক্ষার জন্য ডাকা হয়।
একাডেমিক ফলাফল এবং মৌখিক পরীক্ষার পারফরম্যান্স বিবেচনা করে নিয়োগ বোর্ড সর্বসম্মতিক্রমে ছয়জন প্রার্থীর একটি মেধাক্রম তৈরি করে। কিন্তু চূড়ান্ত অনুমোদনের ঠিক আগে নাটকীয়ভাবে পদের সংখ্যা পুনরায় কমিয়ে তিনটিতে নামিয়ে আনা হয় এবং মেধাতালিকায় কারচুপির আশ্রয় নেওয়া হয়।
মেধাতালিকায় জালিয়াতি ও বিশেষজ্ঞ সদস্যের আপত্তি
নিয়োগ বোর্ডের বিশেষজ্ঞ সদস্য ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগের অধ্যাপক মো. ইস্রাফিল। তিনি জানান, ছয়জনের মেধাতালিকা থেকে যখন তিনজনকে নির্বাচিত করা হয়, তখন দেখা যায় দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা প্রার্থীকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বাদ দিয়ে চতুর্থ স্থানে থাকা প্রার্থীকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই জালিয়াতির প্রতিবাদ জানিয়ে অধ্যাপক ইস্রাফিল চূড়ান্ত মেধাতালিকায় স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানান এবং শুধুমাত্র হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে চলে আসেন।
তার মতে, তৎকালীন উপাচার্য নিজেই প্রার্থীদের নাম ক্রমানুসারে লিখেছিলেন এবং সেখানে কোনো দ্বিমত ছিল না। পরবর্তীতে শুধুমাত্র “নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী” হওয়ার দোহাই দিয়ে মেধাবী প্রার্থীকে বঞ্চিত করা হয়েছে, যা নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য।
বঞ্চিত প্রার্থীর পরিচিতি ও যোগ্যতা
যিনি দ্বিতীয় স্থানে থেকেও নিয়োগ পাননি, সেই এ সালামের একাডেমিক ক্যারিয়ার অত্যন্ত সমৃদ্ধ। নিচে তাঁর যোগ্যতার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া হলো:
| বিষয় | বিবরণ |
| শিক্ষা প্রতিষ্ঠান | ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (উর্দু বিভাগ) |
| স্নাতক ও স্নাতকোত্তর | উভয় পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান |
| উচ্চতর ডিগ্রি | এমফিল (২০১৪) এবং পিএইচডি (২০১৯) |
| স্বীকৃতি | ভালো ফলাফলের জন্য ২ টি স্বর্ণপদক প্রাপ্ত |
| গবেষণা | ১ টি গবেষণা গ্রন্থ ও একাধিক গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত |
| বয়স (আবেদনকালীন) | ৩৯ বছর |
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও বর্তমান পরিস্থিতি
নিয়োগ বোর্ডের সদস্য ও তৎকালীন উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন এই সিদ্ধান্তের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে জানান, বয়সের আধিক্য এবং নিজস্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কারণে এমনটি করা হয়েছে। যদিও বঞ্চিত প্রার্থীর প্রকৃত বয়স ৩৯ বছর হওয়া সত্ত্বেও উপ-উপাচার্য তা ‘৫০ ঊর্ধ্ব’ বলে দাবি করেন। অন্যদিকে, তৎকালীন উপাচার্য সালেহ্ হাসান নকীব এই প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম হয়নি বলে দাবি করেছেন এবং বিশেষজ্ঞ সদস্যের স্বাক্ষর না করাকে সদস্যদের মধ্যকার স্বাভাবিক মতপার্থক্য হিসেবে অভিহিত করেছেন।
বঞ্চিত প্রার্থী এ সালাম ইতিমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের লিগ্যাল সেলে ই-মেইলযোগে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক মো. ফরিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, বিষয়টি গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন এবং জনগণের করের টাকায় পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে মেধার অবমূল্যায়ন ও জালিয়াতির এই ঘটনা শিক্ষক মহলে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।