প্রমথ চৌধুরী: বাংলা সাহিত্যের আধুনিক ‘বীরবল’-এর স্মরণ

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রমথ চৌধুরী একজন অসাধারণ গদ্যকার, প্রাবন্ধিক, কবি এবং বিদ্রূপাত্মক প্রবন্ধকার হিসেবে পরিচিত। চলিত বাংলায় সাহসিকতার সঙ্গে গদ্য রচনার মাধ্যমে তিনি বাংলা গদ্যে একটি স্বতন্ত্র আধুনিক স্বর স্থাপন করেন। তাঁর বিদ্রূপাত্মক প্রবন্ধসমূহ, যা ‘বীরবল’ ছদ্মনামে প্রকাশিত হয়েছিল, বাংলা সাহিত্যকে নতুন ধারায় পরিচিত করেছিল

প্রমথ চৌধুরীর জন্ম ১৮৬৮ সালের ৭ আগস্ট যশোরে। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল পাবনার হরিপুর গ্রাম। বাবা দুর্গাদাস চৌধুরী ছিলেন একজন জমিদার। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা তিনি কলকাতার হেয়ার স্কুলে সম্পন্ন করেন, এরপর পড়াশোনা করেন প্রেসিডেন্সি কলেজ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিছুদিন তিনি কলকাতা হাইকোর্টে আইন পেশায় যুক্ত ছিলেন, পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন কলেজে শিক্ষকতা করেন।

সাহিত্য ও সম্পাদনায় তাঁর পদচারণা ছিল উজ্জ্বল। তিনি সম্পাদনা করেছেন ‘মাসিক সবুজপত্র’, যা বাংলা চলিত গদ্যরীতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এছাড়া ‘বিশ্বভারতী’ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি টেগর এস্টেটের ম্যানেজার হিসেবেও দায়িত্বে ছিলেন এবং ব্যক্তিগতভাবে রবীন্দ্রনাথের ভাইঝির জামাই ছিলেন।

প্রমথ চৌধুরীর সাহিত্যকর্ম বিস্তৃত। তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা নিম্নরূপ:

ধরণগ্রন্থের নাম
প্রবন্ধগ্রন্থতেল-নুন-লাকড়ি, বীরবলের হালখাতা, নানাকথা, আমাদের শিক্ষা, রায়তের কথা, নানাচর্চা
গল্পগ্রন্থচার-ইয়ারী কথা, আহুতি, নীল্লোহিত
কাব্যগ্রন্থসনেট পঞ্চাশৎ, পদচারণ

চলিত ভাষার প্রয়োগে প্রমথ চৌধুরী বিদ্রূপাত্মক গদ্যের উৎকর্ষ এবং আধুনিক প্রবন্ধসাহিত্যের বিকাশে অনন্য অবদান রেখেছেন। তাঁর সাহিত্য সমাজ ও শিক্ষার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেছে, যা পরবর্তী প্রজন্মের লেখকদের জন্য দিকনির্দেশক হিসেবে বিবেচিত হয়।

১৯৪৬ সালের ২ ডিসেম্বর বাংলা সাহিত্যের এই অনন্য ‘বীরবল’ প্রয়াত হন। তাঁর সৃষ্টিশীলতার আলো আজও বাংলা সাহিত্যের পথ আলোকিত করছে। প্রমথ চৌধুরীর সাহিত্যিক পরিচয় শুধু আধুনিক গদ্যের জন্য নয়, বরং বাংলা সমাজ ও সংস্কৃতির ধারাবাহিকতার গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশক হিসেবেও সমাদৃত।