দীর্ঘদিন ধরে চরম আর্থিক সংকটে নিমজ্জিত থাকা দেশের পাঁচটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রথম ধাপে প্রতিষ্ঠানগুলোর বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হবে এবং পরবর্তীতে প্রশাসক নিয়োগ করা হবে। গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের এক গুরুত্বপূর্ণ সভায় এই সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়। সভায় দীর্ঘদিন ধরে ধুঁকতে থাকা মোট নয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সার্বিক পরিস্থিতি ও আর্থিক সক্ষমতা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করা হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বশীল সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বন্ধের তালিকায় থাকা এই পাঁচটি প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে প্রায় ২৭ হাজার ব্যক্তি আমানতকারীর মোট ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকার আমানত রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক আশ্বস্ত করেছে যে, এই অবসায়ন প্রক্রিয়ার আওতায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি আমানতকারীরা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত পাবেন। প্রশাসক নিয়োগের পর প্রতিষ্ঠানগুলোর বিদ্যমান মোট সম্পদ ও প্রকৃত দায়-দেনা মূল্যায়ন করা হবে এবং সেই অনুযায়ী আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হবে।
বিগত বছরগুলোতে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্বল সুশাসন, দুর্নীতি এবং বড় ধরনের ঋণ কেলেঙ্কারির কারণে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক অবস্থার চরম অবনতি হয়েছে। বিশেষ করে বহুল আলোচিত পি কে হালদারের বিরুদ্ধে পিপলস লিজিং, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, এফএএস ফাইন্যান্স এবং বিআইএফসি থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। উচ্চ খেলাপি ঋণ, তীব্র তারল্য সংকট এবং গ্রাহকদের আমানতের টাকা ফেরত দিতে ক্রমাগত ব্যর্থ হওয়ার কারণে গত বছরের মে মাসে ২০টি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিস দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। পরবর্তীতে তাদের পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা মূল্যায়ন করে নয়টি প্রতিষ্ঠানকে চরম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং ধারাবাহিক পর্যালোচনার পর এই পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্তভাবে বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
নিচে বন্ধের প্রক্রিয়ায় থাকা পাঁচটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নাম এবং গত ডিসেম্বর মাস শেষে তাদের খেলাপি ঋণের সর্বশেষ ভয়াবহ চিত্র ছকের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
বন্ধের তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠান ও খেলাপি ঋণের হার
| ক্রমিক নং | আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নাম | খেলাপি ঋণের হার (শতকরা) |
| ১ | এফএএস ফাইন্যান্স | ৯৯.৯৯% |
| ২ | ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস | ৯৯.৪৪% |
| ৩ | ফারইস্ট ফাইন্যান্স | ৯৮.৫০% |
| ৪ | পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস | প্রায় ৯৫.০০% |
| ৫ | আভিভা ফাইন্যান্স | ৯৩.৯৩% |
অন্যদিকে, সভায় অবশিষ্ট চার চরম ঝুঁকিপূর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে তাদের আর্থিক অবস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য একটি শেষ সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি), প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স এবং প্রাইম ফাইন্যান্স। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই চার প্রতিষ্ঠানকে আগামী তিন মাস সময় বেঁধে দিয়েছে। এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যদি তারা সাধারণ ব্যক্তি আমানতকারীদের মূল অর্থ পরিশোধে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়, তবে এই চার প্রতিষ্ঠানকেও একই নিয়মে অবসায়ন বা বন্ধকরণ প্রক্রিয়ার আওতায় আনা হবে।
