বিশেষ অপরাধ প্রতিবেদক, নেত্রকোনা: নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলায় চতুর্থ শ্রেণীর এক স্কুলছাত্রীকে (৯) ধর্ষণের পৈশাচিক ও চাঞ্চল্যকর ঘটনায় দেশব্যাপী তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এই বর্বরোচিত অপরাধের মূল হোতা আবদুর রহিমকে অবশেষে গ্রেফতার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় গাজীপুরের একটি সুনির্দিষ্ট গোপন আস্তানা থেকে তাকে আধুনিক প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গ্রেফতার করা হয়। আজ শুক্রবার সকালে গ্রেফতারকৃত আসামিকে কেন্দুয়া থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
নৃশংসতার বিবরণ ও ঘটনাপ্রবাহ স্থানীয় বাসিন্দা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ভুক্তভোগী শিশুর পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত শনিবার দুপুরে নিজ বাড়ির নিকটবর্তী একটি হাওরে পরিবারের চড়ে বেড়ানো গরু আনতে গিয়েছিল ৯ বছর বয়সী ওই শিশুটি। হাওরের এক নির্জন ও জনমানবহীন স্থানে শিশুটিকে একা পেয়ে ও সুযোগ বুঝে একই এলাকার লম্পট আবদুর রহিম তার ওপর চড়াও হয় এবং জোরপূর্বক পাশবিক নির্যাতন ও ধর্ষণ চালায়।
এদিকে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও শিশুটি বাড়িতে ফিরে না আসায় তার মা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে তাকে খুঁজতে বের হন। হাওরের বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে একটি নির্জন গাছের নিচে তল্লাশি চালানোর সময় তিনি অভিযুক্ত আবদুর রহিমকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখতে পান। শিশুটির মায়ের উপস্থিতি টের পেয়ে ধর্ষক রহিম দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে দৌড়ে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে bloody ও গুরুতর জখম অবস্থায় ওই অবুঝ শিশুকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য প্রথমে স্থানীয় এক গ্রাম্য চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। লোকলজ্জার চরম ভয়, সামাজিক মর্যাদাহানি এবং আকস্মিক আতঙ্কের কারণে পরিবারটি প্রথমে ঘটনাটি প্রকাশ না করে বাড়িতেই রেখে শিশুটিকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিচ্ছিল।
সামাজিক সালিশের নামে নির্মম ধামাচাপা ও মাতবরদের দৌরাত্ম্য এই পৈশাচিক ঘটনার পর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবর্তে অত্যন্ত নিকৃষ্ট এক সামাজিক চিত্র ফুটে ওঠে। স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী মাতবর বিষয়টি সম্পূর্ণ আইনবহির্ভূতভাবে সামাজিকভাবে ধামাচাপা দেওয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়। এলাকার চিহ্নিত মাতবর আবু তাহের এবং আবু বক্কর ভুক্তভোগী অসহায় পরিবারটিকে থানায় গিয়ে আইনি মামলা করতে কঠোরভাবে বাধা প্রদান করেন। একই সাথে ঘটনাটি চিরতরে গোপন রাখার বিনিময়ে এবং মুখ বন্ধ রাখতে পরিবারটিকে মাত্র ৫০ হাজার টাকার প্রলোভন দেখানো হয় এবং নানাবিধ সামাজিক ও মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়।
তবে সমস্ত ভয়ভীতি, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ও আর্থিক প্রলোভন উপেক্ষা করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক অনমনীয় ও শক্ত অবস্থান নেয় শিশুটির পরিবার। গত সোমবার দুপুরে হঠাৎ করেই গুরুতর আহত শিশুটির শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে এবং অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ শুরু হয়। এমতাবস্থায় তাকে দ্রুত কেন্দুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। পরদিন মঙ্গলবার দুপুরে উন্নত চিকিৎসার জন্য এবং তার অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে নেত্রকোনা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে স্থানান্তর করেন। শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি এবং মাতবরদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে অবশেষে মঙ্গলবার দুপুরে শিশুটির পিতা বাদী হয়ে আবদুর রহিমকে একমাত্র এজাহারনামীয় আসামি করে কেন্দুয়া থানায় একটি ধর্ষণ মামলা দায়ের করেন।
ঘটনার সময়ানুক্রমিক কালপঞ্জি (Timeline of Events) সম্পূর্ণ ঘটনাটি এবং এর পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপ সহজে অনুধাবন করার জন্য নিচে একটি নিখুঁত সময়ানুক্রমিক বিবরণী উপস্থাপন করা হলো:
| তারিখ ও দিন | ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ |
| গত শনিবার (দুপুর) | হাওরে গরু আনতে গেলে ৯ বছরের অসহায় শিশুটিকে একা পেয়ে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে আবদুর রহিম। |
| শনিবার থেকে রোববার | সামাজিক লোকলজ্জা ও প্রভাবশালী মাতবরদের প্রবল চাপের মুখে গ্রাম্য চিকিৎসকের মাধ্যমে বাড়িতেই প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান। |
| গত সোমবার (দুপুর) | শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ও রক্তক্ষরণ ঘটলে শিশুটিকে জরুরি ভিত্তিতে কেন্দুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি। |
| গত মঙ্গলবার (দুপুর) | উন্নত চিকিৎসার জন্য নেত্রকোনা জেলা হাসপাতালে স্থানান্তর। মাতবরদের বাধা উপেক্ষা করে থানায় লম্পট রহিমের বিরুদ্ধে নিয়মিত ধর্ষণ মামলা দায়ের। |
| গত বৃহস্পতিবার (সন্ধ্যা) | র্যাবের বিশেষ আভিযানিক দলের যৌথ তৎপরতায় গাজীপুরের একটি গোপন আস্তানা থেকে মূল আসামি আবদুর রহিম গ্রেফতার। |
| আজ শুক্রবার (সকাল) | গ্রেফতারকৃত আসামিকে আইনগত প্রক্রিয়া শেষে কেন্দুয়া থানায় হস্তান্তর এবং আদালতে সোপর্দ করে রিমান্ড আবেদনের প্রস্তুতি সম্পন্ন। |
আইনগত পদক্ষেপ, প্রশাসনের বক্তব্য ও বর্তমান পরিস্থিতি নিজের অবুঝ সন্তানের ওপর এই পৈশাচিক নির্যাতনের বিচার চেয়ে ভুক্তভোগী শিশুটির পিতা চরম ক্ষোভ ও আক্ষেপ প্রকাশ করে গণমাধ্যমকে বলেন:
“আমি প্রথম থেকেই আইনের আশ্রয় নিয়ে আমার মেয়ের ওপর হওয়া এই অন্যায়ের বিচার চেয়েছিলাম। কিন্তু এলাকার মাতবর আবু তাহের ও আবু বক্কর সমাজ ও মীমাংসার ভয় দেখিয়ে আমাদের একপ্রকার গৃহবন্দী ও অবরুদ্ধ করে রাখে। আমরা এই পৈশাচিক, দানবীয় ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই এবং ধর্ষক রহিমের দৃষ্টান্তমূলক ফাঁসি চাই। একই সাথে যারা টাকার লোভ দেখিয়ে অপরাধীকে আড়াল করতে চেয়েছিল, সেই সমাজপতিদেরও দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।”
এদিকে ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে জানাজানি হওয়ার পর এবং থানায় নিয়মিত মামলা রুজু হওয়ার খবর পেয়ে সোমবার সকাল থেকেই অভিযুক্ত দুই মাতবর আবু তাহের ও আবু বক্কর এলাকা ছেড়ে দ্রুত আত্মগোপনে চলে গেছেন। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের আটকের জন্য অভিযান চালালেও বর্তমানে তাদের মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।
এই বর্বরোচিত ঘটনার বিষয়ে কেন্দুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেহেদি মাকসুদ আজ সকালে সাংবাদিকদের জানান, স্পর্শকাতর এই মামলার প্রধান আসামি আবদুর রহিমকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ সহায়তায় গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছে। তাকে আজই বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডের আবেদন জানানো হবে। তিনি আরও নিশ্চিত করেন যে, আক্রান্ত শিশুটি বর্তমানে যথাযথ চিকিৎসা শেষে অনেকটাই সুস্থ হয়ে নিজ বাড়িতে ফিরে গেছে। ওসি আরও দৃঢ়তার সাথে বলেন, গ্রাম্য সালিশের নামে যারা আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছে এবং একটি অসহায় পরিবারকে আইনি সহায়তা নিতে বাধা প্রদান করেছে, তদন্ত সাপেক্ষে সেই সকল মাতবরদের বিরুদ্ধেও সুনির্দিষ্ট ধারায় কঠোর আইনগত ব্যবস্থা (যেমন: দণ্ডবিধির অপরাধীকে আশ্রয় দেওয়া বা আলামত গোপনের ধারা) গ্রহণ করা হবে। অপরাধী কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
প্রাসঙ্গিক আইনি বিশ্লেষণ: বাংলাদেশের প্রচলিত ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০২০)’-এর ৯(১) ধারা অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন, তবে তিনি মৃত্যুদণ্ডে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন এবং এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হবেন। স্থানীয় মানবাধিকার কর্মীরা এই ঘটনার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে শুনানির দাবি জানিয়েছেন, যেন অপরাধী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পায় এবং সমাজে এর একটি কঠোর বার্তা পৌঁছায়।
