জি- লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ৬ই আগস্ট ২০২৬, ৫:২১ পিএম

বাংলাদেশ ক্রিকেট দল দীর্ঘ ২৩ বছর পর টেস্ট সিরিজ খেলতে অস্ট্রেলিয়া সফরে রয়েছে। দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ শুরুর আগে ডারউইনে অনুষ্ঠিত একমাত্র প্রস্তুতি ম্যাচে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের বিপক্ষে নিজেদের প্রস্তুতি যাচাইয়ের সুযোগ পায় নাজমুল হোসেন শান্তর দল। তবে ব্যাটিংয়ে প্রত্যাশিত ধারাবাহিকতা দেখাতে না পারায় সফরকারীরা প্রথম ইনিংসে ৭৫.৫ ওভারে ২৬৩ রানেই অলআউট হয়। দলের ব্যাটিং ধসের মধ্যেও একাই প্রতিরোধ গড়ে তুলে অপরাজিত সেঞ্চুরি করেন অলরাউন্ডার মেহেদী হাসান মিরাজ, যা সিরিজের আগে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) ডারউইনে অনুষ্ঠিত এই প্রস্তুতি ম্যাচে টস জিতে প্রথমে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। শুরু থেকেই ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের বোলাররা নিয়ন্ত্রিত লাইন-লেংথে বল করে বাংলাদেশের ব্যাটারদের চাপে রাখেন। নতুন বলে বাড়তি বাউন্স ও গতি কাজে লাগিয়ে তারা দ্রুতই সফরকারীদের ব্যাটিং লাইনআপে ধস নামান।
মাত্র ৭ রানেই প্রথম উইকেট হারায় বাংলাদেশ। ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম ৮ বল মোকাবিলা করেও রানের খাতা খুলতে পারেননি। হ্যানো জ্যাকবসের বলে স্যাম কন্সটাসের হাতে ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফেরেন তিনি। অপর প্রান্তে সাদমান ইসলাম কিছুটা লড়াইয়ের আভাস দিলেও ইনিংস বড় করতে পারেননি। ৪৭ বলে ৩১ রান করে কোরি রকিচোলির শিকার হন এই বাঁহাতি ব্যাটার।
এরপর অভিজ্ঞ ব্যাটার মুমিনুল হকও ব্যর্থ হন। ১৬ রান করে তিনিও রকিচোলির বলে আউট হন। আরও বড় ধাক্কা আসে মুশফিকুর রহিমের বিদায়ে। মাত্র চার বল খেলেই কোনো রান না করে ফিরে যান এই অভিজ্ঞ উইকেটরক্ষক-ব্যাটার। ফলে মধ্যাহ্ন বিরতির আগেই ৭৮ রান তুলতে বাংলাদেশ হারিয়ে ফেলে চারটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট।
দ্বিতীয় সেশনে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত ও অমিত হাসান ইনিংস গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। দুজন কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তুললেও বড় জুটি গড়তে পারেননি। অমিত ১৫ রান করে বিদায় নেন। শান্ত ৩৭ রানের দায়িত্বশীল ইনিংস খেললেও সেটিকে বড় স্কোরে রূপ দিতে পারেননি। এরপর সৌম্য সরকারও ১৬ রান করে আউট হলে বাংলাদেশের ইনিংস আবারও চাপে পড়ে।
এই কঠিন সময়ে দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন মেহেদী হাসান মিরাজ। শুরুতে ধৈর্যের সঙ্গে উইকেটে সময় কাটিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেন তিনি। পরে সুযোগ বুঝে আক্রমণাত্মক ব্যাটিংও করেন। ১৪১ বলের দুর্দান্ত ইনিংসে ১১টি চার ও ৪টি ছক্কার সাহায্যে অপরাজিত ১০৯ রান করেন মিরাজ। ইনিংসজুড়ে তার শট নির্বাচনে ছিল পরিণত ভাব, আবার প্রয়োজন অনুযায়ী রান তোলার গতি বাড়ানোর সক্ষমতাও ছিল চোখে পড়ার মতো। দলের অন্য প্রান্তে নিয়মিত উইকেট পড়লেও শেষ পর্যন্ত অপরাজিত থেকে বাংলাদেশের সংগ্রহকে ২৬৩ রানে নিয়ে যান তিনি।
প্রথম সারির ব্যাটারদের ব্যর্থতার দিনে মিরাজের এই শতক বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। তিনি শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য অর্জন করেননি, বরং কঠিন কন্ডিশনে দীর্ঘ সময় ব্যাট করে দলের আত্মবিশ্বাসও বাড়িয়েছেন। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অতিরিক্ত বাউন্স ও গতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার যে চ্যালেঞ্জ থাকে, সেই পরীক্ষায় অন্তত একজন ব্যাটার সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছেন।
বল হাতে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের হয়ে সবচেয়ে উজ্জ্বল ছিলেন অফস্পিনার কোরি রকিচোলি। ২৮ বছর বয়সী এই স্পিনার একাই ৬টি উইকেট শিকার করে বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপকে বড় ধাক্কা দেন। বাকি চারটি উইকেট ভাগাভাগি করে নেন দলের অন্য চার বোলার। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই বোলারদের কেউই এখনো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক করেননি। তবুও তারা শৃঙ্খলাবদ্ধ বোলিং, সঠিক লাইন-লেংথ এবং ধারাবাহিক চাপ সৃষ্টি করে বাংলাদেশকে বড় সংগ্রহ গড়ার সুযোগ দেননি।
প্রস্তুতি ম্যাচের ফলাফল সাধারণত মূল সিরিজের তুলনায় কম গুরুত্ব বহন করলেও খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স, ম্যাচ ফিটনেস এবং কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এমন ম্যাচের গুরুত্ব অনেক বেশি। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ার উইকেটে সফল হতে হলে টপ অর্ডারের দৃঢ়তা, নতুন বল সামলানোর দক্ষতা এবং দীর্ঘ সময় ক্রিজে থাকার মানসিক প্রস্তুতি অপরিহার্য।
সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের জন্য এই ম্যাচে যেমন উদ্বেগের জায়গা তৈরি করেছে শীর্ষ ও মধ্যক্রমের ব্যাটিং ব্যর্থতা, তেমনি আশার আলো দেখিয়েছে মেহেদী হাসান মিরাজের অসাধারণ শতক। টিম ম্যানেজমেন্ট এখন এই প্রস্তুতি ম্যাচের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ব্যাটিংয়ের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার দিকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেবে। কারণ মূল টেস্ট সিরিজে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াই গড়ে তুলতে হলে ব্যাটিং ইউনিটকে আরও আত্মবিশ্বাসী ও ধারাবাহিক হতে হবে।
মন্তব্য