সংযুক্ত আরব আমিরাতে সাম্প্রতিক ড্রোন হামলার ঘটনার পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে—এমন আশঙ্কা ছড়িয়ে পড়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি পায় এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়ে অপরিশোধিত তেলের দামে। সোমবার (১৮ মে) বিশ্ববাজারে তেলের মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়, একই সঙ্গে বৈশ্বিক শেয়ার ও বন্ড বাজারেও চাপ তৈরি হয়।
রোববার সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে। এতে স্থাপনার একটি জেনারেটর ইউনিটে আগুন ধরে যায় এবং সাময়িকভাবে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এই ঘটনার পর মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়, কারণ এই অঞ্চল বিশ্বজুড়ে তেল সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।
বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দামে দ্রুত ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা যায়। ব্রেন্ট ধরনের তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১১০ দশমিক ৬৩ মার্কিন ডলারের সমপর্যায়ে পৌঁছায়, যা আগের দিনের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ২ শতাংশ বেশি। একই সময়ে পশ্চিম টেক্সাস মধ্যমানের তেলের দাম দাঁড়ায় ১০৬ দশমিক ৪২ ডলার, যা প্রায় ১ শতাংশ বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। বিশ্লেষকদের মতে, সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা বাজারে এই তীব্র প্রতিক্রিয়ার প্রধান কারণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে চলমান উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে পরিচালিত হয়। ফলে এখানে কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি হলে তা বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে তাৎক্ষণিক ও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
একাধিক গবেষণা সংস্থা সতর্ক করেছে যে, যদি এই প্রণালিতে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে, তবে বিশ্ববাজারে তেলের মজুত দ্রুত হ্রাস পেতে পারে। এর ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৩০ থেকে ১৪০ ডলারের কাছাকাছি বা তারও বেশি হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি সংকট দেখা দিলে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যের মতো অঞ্চলে মূল্যস্ফীতি দ্বিগুণ অঙ্কের কাছাকাছি পৌঁছানোর ঝুঁকি রয়েছে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার আবারও বাড়াতে বাধ্য হতে পারে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে মন্দার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি (সারসংক্ষেপ)
| খাত | বর্তমান অবস্থা | পরিবর্তন |
|---|---|---|
| ব্রেন্ট ধরনের অপরিশোধিত তেল | প্রতি ব্যারেল ১১০.৬৩ ডলার | বৃদ্ধি প্রায় ১.২ শতাংশ |
| পশ্চিম টেক্সাস মধ্যমান তেল | প্রতি ব্যারেল ১০৬.৪২ ডলার | বৃদ্ধি প্রায় ১ শতাংশ |
| যুক্তরাষ্ট্রের দশ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ড | ৪.৫৮৪ শতাংশ | বৃদ্ধি ২৩ ভিত্তি পয়েন্ট |
| যুক্তরাষ্ট্রের ত্রিশ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ড | ৫.১০৯ শতাংশ | উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি |
| জাপানের শেয়ার সূচক | নিক্কেই সূচক | পতন ০.৪ শতাংশ |
| দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ার বাজার | প্রধান সূচক | পতন ২.১ শতাংশ |
| এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় সম্মিলিত সূচক | সমন্বিত সূচক | পতন ০.৬ শতাংশ |
বন্ড বাজারেও স্পষ্ট পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় বিনিয়োগকারীরা তুলনামূলক নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝুঁকছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, শেয়ারবাজারে দেখা গেছে মিশ্র প্রবণতা—এশিয়ার বেশিরভাগ বাজারে পতন ঘটলেও চীনের বাজার চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানের কাছাকাছি রয়েছে।
চীনের খুচরা বিক্রি ও শিল্প উৎপাদন সম্পর্কিত নতুন তথ্য প্রকাশের অপেক্ষায় বিনিয়োগকারীরা বর্তমানে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারের ভবিষ্যৎ সূচকেও দিনের শুরুতে পতন দেখা গেছে, যা বৈশ্বিক বিনিয়োগ পরিবেশে অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা যদি অব্যাহত থাকে, তবে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হবে এবং এর প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রায় সব খাতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
