খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২ই জুলাই ২০২৬, ১১:০ পিএম

দেশের নারী ও কন্যাশিশুদের ওপর সহিংসতার ঘটনা ক্রমান্বয়ে উদ্বেগজনক রূপ নিচ্ছে। সদ্য বিদায়ী জুন মাসে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অন্তত ৩৩৩ জন নারী ও কন্যাশিশু ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এবারের পরিসংখ্যানের সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হলো, মোট ভুক্তভোগীদের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের চেয়ে অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যাশিশুদের সংখ্যাই বেশি। পুরো মাসজুড়ে সবচেয়ে বেশি যেসব অপরাধের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, তার শীর্ষে রয়েছে ধর্ষণ এবং ধর্ষণ-সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সহিংসতা।
দেশের প্রধান ১৫টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদের ওপর ভিত্তি করে এই মাসিক পরিসংখ্যান প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় লিগ্যাল এইড উপ-পরিষদ। সম্প্রতি ১ জুলাই (বুধবার) গণমাধ্যমে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সংস্থাটি এই তথ্য জনসমক্ষে আনে।
Table of Contents
প্রকাশিত প্রতিবেদনটির তথ্য বিশদভাবে বিশ্লেষণ করলে দেশের সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তার এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে। জুন মাসে যে ৩৩৩ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছেন, তাদের মধ্যে ১৭৭ জনই হলো কন্যাশিশু এবং ১৫৬ জন প্রাপ্তবয়স্ক নারী।
পুরো মাসে মোট ১০০টি ধর্ষণ ও ধর্ষণ-সংশ্লিষ্ট ঘটনা ঘটেছে। এই তালিকায় দেখা যায়, ৭২ জন কন্যাশিশু এবং ২৮ জন প্রাপ্তবয়স্ক নারী পাশবিক ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, সমাজে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের (গ্যাং রেপ) মতো নৃশংস অপরাধও আশঙ্কাজনক হারে ঘটেছে। মাসটিতে মোট ২৪ জন সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন, যার মধ্যে ১২ জনই কন্যাশিশু। সবচেয়ে নির্মম বিষয় হলো, ধর্ষণের পর লোকলজ্জা বা অপরাধ ঢাকতে সাতজন কন্যাশিশুকে হত্যা করা হয়েছে এবং এই চরম মানসিক ট্রমা সইতে না পেরে একজন কন্যাশিশু আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে। এছাড়া আরও ৩৪ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা চালানো হয়েছে, যাদের মধ্যে ৩১ জনই অবুঝ কন্যাশিশু।
ধর্ষণ ছাড়াও জুন মাসে বিপুলসংখ্যক নারী ও শিশুর অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পারিবারিক কলহ, শত্রুতা কিংবা নানা সামাজিক কারণে মোট ৫৪ জন নারী ও কন্যাশিশু নিহত হয়েছেন। এই হত্যাকাণ্ডের শিকারদের মধ্যে ৪৫ জন নারী এবং ৯ জন কন্যাশিশু। এর বাইরে আরও ৩৩ জনের রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে, যার প্রকৃত কারণ উদঘাটন করা সম্ভব হয়নি। একই সময়ে পারিবারিক ও সামাজিক নানামুখী মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে ১২ জন নারী ও শিশু আত্মহত্যা করেছেন।
যৌন নিপীড়ন ও উত্ত্যক্তকরণের (ইভটিজিং) মতো ঘটনাগুলোও নারীদের ঘরের বাইরে চলাফেরাকে অনিরাপদ করে তুলছে। জুনে মোট ৪৩ জন নারী ও শিশু এমন যৌন সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছেন। এর মধ্যে সরাসরি যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন ১১ জন এবং বখাটেদের উত্ত্যক্তের শিকার হয়েছেন ২৯ জন। এছাড়াও সমাজে টিকে থাকা প্রাচীন কিছু ব্যাধি যেমন যৌতুক বা পণ-সংক্রান্ত সহিংসতার শিকার হয়েছেন পাঁচজন নারী। ৩ জন ভুক্তভোগী এসিড ও অগ্নিদগ্ধের মতো নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছেন এবং জুন মাসে অন্তত দুজন নারী ও কন্যাশিশু পাচারের শিকার হয়েছেন। এর পাশাপাশি ১৯ জন নারী ও শিশু মারাত্মক শারীরিক নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছেন।
নৃশংসতার এই ধারাবাহিক চিত্র দেখে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। সংস্থাটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নারী ও কন্যাশিশুদের প্রতি এই ক্রমবর্ধমান সহিংসতা প্রতিরোধ করতে হলে শুধু কাগজে-কলমে আইন থাকলেই চলবে না। বিদ্যমান আইনের কঠোর ও কার্যকর বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। অপরাধীদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিচারের মুখোমুখি করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা দরকার, যেন কেউ পার পেয়ে যাওয়ার সাহস না পায়। আইনগত ব্যবস্থার পাশাপাশি এই সামাজিক ব্যাধি রুখতে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ এবং সামাজিক প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ আরও জোরদার করার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রতিবেদন থেকে সংগৃহীত নির্দিষ্ট খাতভিত্তিক অপরাধ ও ভুক্তভোগীদের সংখ্যা নিচে একটি তালিকার মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
| ক্রমিক | অপরাধ ও সহিংসতার ধরণ | ভুক্তভোগীর সংখ্যা / ঘটনা |
| ১ | জুন মাসে মোট নির্যাতনের শিকার (নারী ও শিশু) | ৩৩৩ জন |
| ২ | মোট ভুক্তভোগী কন্যাশিশুর সংখ্যা | ১৭৭ জন |
| ৩ | মোট ভুক্তভোগী প্রাপ্তবয়স্ক নারীর সংখ্যা | ১৫৬ জন |
| ৪ | মোট ধর্ষণ ও ধর্ষণ-সংশ্লিষ্ট অপরাধের ঘটনা | ১০০টি |
| ৫ | ধর্ষণের শিকার মোট কন্যাশিশু | ৭২ জন |
| ৬ | বিভিন্ন কারণে মোট নিহত নারী ও কন্যাশিশু | ৫৪ জন |
| ৭ | হত্যাকাণ্ডের শিকার প্রাপ্তবয়স্ক নারী | ৪৫ জন |
| ৮ | জুনে মোট রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনা | ৩৩টি |
| ৯ | বখাটেদের দ্বারা উত্ত্যক্তের (ইভটিজিং) শিকার | ২৯ জন |
| ১০ | ধর্ষণের শিকার প্রাপ্তবয়স্ক নারী | ২৮ জন |
| ১১ | সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার (১২ জন শিশু ও ১২ জন নারী) | ২৪ জন |
| ১২ | ঘরের ভেতরে বা বাইরে শারীরিক নির্যাতনের শিকার | ১৯ জন |
| ১৩ | বিভিন্ন কারণে মোট আত্মহত্যার ঘটনা | ১২টি |
| ১৪ | যৌন নিপীড়নের (সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট) শিকার | ১১ জন |
| ১৫ | হত্যাকাণ্ডের শিকার কন্যাশিশু | ৯ জন |
| ১৬ | ধর্ষণের পর নির্মমভাবে নিহত কন্যাশিশু | ৭ জন |
| ১৭ | যৌতুক বা পণ-সংক্রান্ত সহিংসতার শিকার | ৫ জন |
| ১৮ | এসিড নিক্ষেপ ও অগ্নিদগ্ধের শিকার ভুক্তভোগী | ৩ জন |
| ১৯ | নারী ও কন্যাশিশু পাচারের শিকার | ২ জন |
| ২০ | ধর্ষণের কারণে আত্মহত্যা করা কন্যাশিশু | ১ জন |
মন্তব্য