বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস সফলভাবে আয়োজনের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে অনন্য প্রশংসা কুড়িয়েছিল বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী। ২০০৩ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী এই দিবসটি পালন শুরু হলেও বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো এটি উদযাপনের মূল তত্ত্বাবধানে ছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ মাহবুব হায়দার খান। ২০০৭ সালে তিনি সেনাবাহিনী সদর দপ্তরের ওভারসিজ অপারেশনস ডিরেক্টরেটের পরিচালক (চেয়ারম্যান) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
তার দূরদর্শী নেতৃত্বে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানটি দেশের মাটিতে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের গৌরবময় অবদানকে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপকভাবে তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই সফল আয়োজনের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৭ সালের ৩১ মে জাতিসংঘের তৎকালীন আবাসিক সমন্বয়কারী রেনাটা লোক-দেসালিয়েন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুব হায়দার খানের উদ্দেশে একটি আনুষ্ঠানিক প্রশংসাপত্র পাঠান।
চিঠিতে রেনাটা লোক-দেসালিয়েন উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে এই দিবসটি উদযাপনের মাধ্যমে দেশের সাধারণ মানুষের সামনে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান ও আত্মত্যাগ অত্যন্ত নিপুণভাবে তুলে ধরা সম্ভব হয়েছে। অনুষ্ঠানের সফল বাস্তবায়নে আয়োজকদের নিষ্ঠা, পরিশ্রম এবং আত্মনিবেদিত প্রচেষ্টার ভূয়সী প্রশংসা করেন তিনি। তার মতে, অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী বিশিষ্ট অতিথিরা আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অর্জন ও অবদান সম্পর্কে একটি বিস্তৃত, সুনির্দিষ্ট ও তথ্যসমৃদ্ধ ধারণা লাভ করতে সক্ষম হন। বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী এবং বিশেষ করে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ মাহবুব হায়দার খানের নেতৃত্ব ও সমন্বয় এই অনুষ্ঠানটিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল, যার জন্য জাতিসংঘের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ও অগ্রযাত্রার ইতিহাস
জাতিসংঘের শান্তি রক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অংশ নেওয়ার ইতিহাস দীর্ঘ ৩৮ বছরের। ১৯৮৮ সালে ইরাক-ইরানে সামরিক পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই গৌরবময় যাত্রা শুরু হয়। এরপর ক্রমান্বয়ে সশস্ত্র বাহিনীর অন্যান্য শাখা এবং পুলিশ বাহিনী এই কার্যক্রমে যুক্ত হয়।
বাংলাদেশ পুলিশ: ১৯৮৯ সালে নামিবিয়া মিশনের মাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশ প্রথম জাতিসংঘ পরিবারের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়।
বাংলাদেশ নৌ ও বিমানবাহিনী: ১৯৯৩ সাল থেকে বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী সরাসরি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালন শুরু করে।
বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সুপ্রতিষ্ঠিত। বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা এ পর্যন্ত বিশ্বের ৪৩টি দেশ ও স্থানে মোট ৬৩টি জাতিসংঘ মিশন সফলতার সঙ্গে সম্পন্ন করেছেন। এসব মিশনে সর্বমোট ২ লাখ ৬ হাজার ৪৭৬ জন শান্তিরক্ষী দায়িত্ব পালন করেছেন, যার মধ্যে নারী শান্তিরক্ষীর সংখ্যা ৩ হাজার ৬৪৫ জন। বর্তমানে জাতিসংঘের ৯টি সক্রিয় শান্তি রক্ষা মিশনে বাংলাদেশের ৪ হাজার ৪১২ জন শান্তিরক্ষী দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন।
বাহিনীভিত্তিক শান্তিরক্ষী ও আত্মত্যাগের পরিসংখ্যান
বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার এই মহান দায়িত্বে নিয়োজিত থেকে বাংলাদেশের বহু বীর সন্তান নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন এবং অনেকে আহত হয়েছেন। শুরু থেকে এ পর্যন্ত মোট ১৭৫ জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী বিশ্বমঞ্চে জীবন উৎসর্গ করেছেন এবং দায়িত্ব পালনকালে আহত হয়েছেন ২৮৭ জন।
নিচে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের বিভিন্ন বাহিনীর অংশগ্রহণ ও আত্মত্যাগের একটি তুলনামূলক পরিসংখ্যান দেওয়া হলো:
| বাহিনীর নাম | অংশগ্রহণের শুরুর বছর | মোট অংশগ্রহণকারী শান্তিরক্ষী | জীবন উৎসর্গকারী সদস্য |
| বাংলাদেশ সেনাবাহিনী | ১৯৮৮ | ১,৬২,০৩৫ জন | ১৩৮ জন |
| বাংলাদেশ পুলিশ | ১৯৮৯ | ২১,৮২৮ জন (নারী: ১,৯২৮ জন) | ২৪ জন |
| বাংলাদেশ নৌবাহিনী | ১৯৯৩ | তথ্য উপলব্ধ নয় | ৪ জন |
| বাংলাদেশ বিমানবাহিনী | ১৯৯৩ | তথ্য উপলব্ধ নয় | ৯ জন |
| সর্বমোট | — | ২,০৬,৪৭৬ জন (নারী: ৩,৬৪৫ জন) | ১৭৫ জন |
বাংলাদেশে বর্তমান প্রেক্ষাপটে শান্তিরক্ষী দিবস উদযাপন
যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস পালন করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিবছর ২৯ মে দিবসটি বিশ্বজুড়ে উদযাপিত হলেও, বাংলাদেশে এবার নির্ধারিত সময়ে ঈদের ছুটি থাকায় দিবসটি পুনঃনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী আজ বুধবার দেশব্যাপী উদযাপিত হচ্ছে। দেশের মাটিতে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী দিবস উদযাপনের সেই ঐতিহাসিক উদ্যোগ আজ বাংলাদেশের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের ইতিহাসে একটি অন্যতম প্রধান মাইলফলক হিসেবে স্মরণ করা হয়।
