খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ই মার্চ ২০২৬, ৪:৩২ পিএম

চীন বর্তমানে প্রশান্ত মহাসাগর, ভারত মহাসাগর ও আর্কটিক অঞ্চলে এক নীরব কিন্তু ব্যাপক সমুদ্র অভিযান চালাচ্ছে। দেশটি সমুদ্রের তলদেশের বিস্তারিত ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরির পাশাপাশি পানির নিচে সেন্সর নেটওয়ার্ক স্থাপন করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাবমেরিন যুদ্ধের ক্ষেত্রে এই ধরনের তথ্যের কোনো বিকল্প নেই।
রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চীনের ওশান ইউনিভার্সিটির গবেষণা জাহাজ ‘ডং ফাং হং–৩’ ২০২৪ ও ২০২৫ সালে তাইওয়ান এবং গুয়ামের কাছের মার্কিন সামরিক ঘাঁটি সহ বিভিন্ন কৌশলগত এলাকায় নিয়মিত যাতায়াত করেছে। ভারত মহাসাগরেও জাহাজটির উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।
ওশান ইউনিভার্সিটির তথ্যমতে, জাপানের নিকটবর্তী সমুদ্রের তলদেশে চীন উন্নত সেন্সর নেটওয়ার্ক স্থাপন করেছে, যা পানির নিচের যেকোনো চলাচল শনাক্ত করতে সক্ষম।
| সাল | স্থান | কার্যক্রম | লক্ষ্য/বৈশিষ্ট্য |
|---|---|---|---|
| ২০২৪ অক্টোবর | জাপানের নিকটবর্তী সমুদ্র | সেন্সর রক্ষণাবেক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহ | মার্কিন ও মিত্রবাহিনীর সাবমেরিন নজরদারি |
| ২০২৫ মে | একই এলাকা | পুনরায় নজরদারি | শক্তিশালী সেন্সর নেটওয়ার্ক যাচাই |
| ২০২৫ মার্চ | শ্রীলঙ্কা–ইন্দোনেশিয়া জলসীমা | আঁকাবাঁকা পথে জরিপ | মালাক্কা প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ |
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কোনো জাহাজ যখন নির্দিষ্ট এলাকায় সমান্তরালভাবে বারবার চলে, তখন তা মূলত সমুদ্রের তলদেশের নিখুঁত মানচিত্র তৈরিতে নিযুক্ত।
ওশান ইউনিভার্সিটি দাবি করেছে, জাহাজটি কেবল বৈজ্ঞানিক গবেষণা করছে। তবে তাদের প্রকাশিত নিবন্ধে দেখা গেছে, প্রকৃতপক্ষে তলদেশের বিস্তারিত মানচিত্র তৈরির কাজও হচ্ছে। মার্কিন নৌবাহিনী ও নৌবিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মানচিত্র চীনের সাবমেরিন পরিচালনা ও শত্রুপক্ষ শনাক্তকরণে অমূল্য সম্পদ হিসেবে কাজ করবে।
রয়টার্সের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চীনের এই উদ্যোগ একাধিক গবেষণা জাহাজ এবং শত শত সেন্সর ব্যবহার করে চলছে। অন্তত আটটি জাহাজ সরাসরি তলদেশের মানচিত্রে নিযুক্ত, আরও ১০টির কাছে মানচিত্র তৈরির সকল আধুনিক সরঞ্জাম রয়েছে।
২০১৪ সালে ওশান ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানী উ লিক্সিন ‘ট্রান্সপারেন্ট ওশান’ বা ‘স্বচ্ছ মহাসাগর’ প্রকল্প প্রস্তাব করেন। প্রাথমিকভাবে দক্ষিণ চীন সাগর থেকে শুরু হওয়া এই প্রকল্প এখন প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগরে বিস্তৃত।
চীনা গবেষকরা দাবি করেছেন, এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পানির তাপমাত্রা, লবণাক্ততা ও স্রোতের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। যদিও তথ্য আদান-প্রদানের জটিলতার কারণে কিছুটা দেরি হয়, তবুও এটি মার্কিন সাবমেরিন শনাক্তকরণে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
অস্ট্রেলিয়া ও মার্কিন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই উদ্যোগ শুধুমাত্র খনিজ সম্পদ আহরণের জন্য নয়; বরং চীন গভীর সমুদ্রে যুদ্ধ সক্ষম নৌবাহিনী গড়তে চাইছে। প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের অধীনে বেসামরিক ও সামরিক গবেষণার সংমিশ্রণ ‘সিভিল-মিলিটারি ফিউশন’ নীতিতে এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
মার্কিন নেভাল ওয়ার কলেজের বিশেষজ্ঞ রায়ান মার্টিনসন মন্তব্য করেছেন, ‘চীনের এই বিস্তৃত সমুদ্র জরিপ সত্যিই আশ্চর্যজনক। বহু দশক ধরে মার্কিন নৌবাহিনী মনে করত, সমুদ্রের তলদেশে তাদের একচেটিয়া জ্ঞান রয়েছে। চীনের অভিযান সেই শ্রেষ্ঠত্বকে চ্যালেঞ্জ করছে।’
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেছেন, চীনের এই মানচিত্র ও সেন্সর নেটওয়ার্ক তাদের সাবমেরিনকে লুকানো, শত্রুপক্ষ শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনে অস্ত্র মোতায়েনে সক্ষম করবে। ভারতের সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ নিরাপদ রাখতে চীন ভারত মহাসাগরেও সাবমেরিন মোতায়েনের পরিকল্পনা করছে।
চীনের এই নজরদারি কার্যক্রমের মাধ্যমে তারা বিশ্বজুড়ে জলসীমায় প্রভাব বিস্তার এবং সাবমেরিন যুদ্ধের প্রস্তুতি শক্তিশালী করছে।
মন্তব্য