খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ই জুন ২০২৬, ৩:৬ পিএম

চট্টগ্রাম নগরীর তীব্র যানজট নিরসনে স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল ২৫ হাজার কোটি টাকার এক মেগা মনোরেল প্রকল্পের। কিন্তু সেই স্বপ্নের বেলুন ফুটো হয়ে গেল নজিরবিহীন এক জালিয়াতির ঘটনায়। মিশরের একটি নামকরা কনসোর্টিয়ামের ভুয়া প্রতিনিধির সাথে সই হওয়া এই প্রকল্পের সব ধরনের চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক চূড়ান্তভাবে বাতিল করেছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)। গত ২৪ জুন চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশের মাধ্যমে এই আলোচিত প্রকল্পটির কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়া হয়।
ঘটনার সূত্রপাত হয় ঢাকায় অবস্থিত মিশরীয় দূতাবাসের একটি সতর্কতামূলক চিঠির মাধ্যমে। গত ২২ জুন দূতাবাস থেকে সরাসরি বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (বিডা) চিঠি দিয়ে একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য জানানো হয়। সেখানে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়, কাউসার আলম চৌধুরী নামের যে ব্যক্তি নিজেকে ‘আরব কন্ট্রাক্টরস ওরাসকম পেনিনসুলা কনসোর্টিয়াম’-এর প্রতিনিধি হিসেবে দাবি করে আসছেন, তিনি আসলে একজন প্রতারক। মূল কনসোর্টিয়ামের সাথে তার কোনো ধরনের আইনি বা দাপ্তরিক সম্পর্ক নেই।
এই তথ্য হাতে পাওয়ার পর দ্রুত নড়েচড়ে বসে চসিক। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দূতাবাসের চিঠির সত্যতা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করার পর সিটি কর্পোরেশন বুঝতে পারে, এই ভুয়া প্রতিনিধির সাথে হওয়া চুক্তিগুলো টিকিয়ে রাখার কোনো আইনি ভিত্তি আর অবশিষ্ট নেই। ফলশ্রুতিতে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
অথচ এই মেগা প্রকল্প নিয়ে একসময় ব্যাপক ডামাডোল বাজানো হয়েছিল। গত বছরের ১ জুন চট্টগ্রামে মনোরেলের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য চসিক এবং ওই মিশরীয় কনসোর্টিয়ামের মধ্যে বেশ ঘটা করেই একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। সেখানে কনসোর্টিয়ামের পক্ষে সই করেন ওই কাউসার আলম। প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিতে একই বছরের ২৪ জুন দুই পক্ষের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিও সম্পাদিত হয়। ২৫ হাজার কোটি টাকার এই বিশাল বিনিয়োগ প্রস্তাব নিয়ে সরকার ও নীতি-নির্ধারণী পর্যায়েও বেশ আলোচনা শুরু হয়েছিল। চসিক মেয়রের পক্ষ থেকে প্রকল্পের অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতার জন্য বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান বরাবর চিঠি (ডিও লেটার) দেওয়া হয়েছিল। সেই চিঠির সূত্র ধরে বিডাও সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং বিদ্যুৎ বিভাগকে বিষয়টি জানিয়েছিল। কিন্তু গোড়াতেই এমন গলদ ধরা পড়ায় পুরো প্রক্রিয়াটি এখন ভেস্তে গেছে।
চুক্তি বাতিলের আদেশের অনুলিপি ইতিমধ্যে বিডা, স্থানীয় সরকার বিভাগ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আফ্রিকা অনুবিভাগ এবং চসিকের প্রধান প্রকৌশলী ও আইন কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। প্রতারক চক্রটি যেন আর কোনো দপ্তরে গিয়ে এই ভুয়া চুক্তির ফায়দা লুটতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এক নজরে বাতিলকৃত প্রকল্প ও ভবিষ্যৎ পরিবহন পরিকল্পনা
| বিষয়ের বিবরণ | প্রাসঙ্গিক তথ্য |
| প্রকল্পের নাম | চট্টগ্রাম মনোরেল প্রকল্প (প্রস্তাবিত) |
| সম্ভাব্য বাজেট | প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা |
| বাতিলকারী কর্তৃপক্ষ | চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) |
| চুক্তি বাতিলের তারিখ | ২৪ জুন |
| কথিত কনসোর্টিয়ামের নাম | আরব কন্ট্রাক্টরস ওরাসকম পেনিনসুলা |
| ভুয়া প্রতিনিধির নাম | কাউসার আলম চৌধুরী |
| প্রতারণা উন্মোচনকারী | ঢাকায় অবস্থিত মিশরীয় দূতাবাস |
| বিকল্প মহাপরিকল্পনা | চট্টগ্রাম সমন্বিত পরিবহন মহাপরিকল্পনা |
| মহাপরিকল্পনা প্রণয়নকারী | ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) |
| মহাপরিকল্পনার বাজেট | ৭০ কোটি ৬৩ লাখ টাকা |
| অর্থায়নকারী সংস্থা | বাংলাদেশ সরকার ও কোইকা (দক্ষিণ কোরিয়া) |
| মহাপরিকল্পনার মেয়াদকাল | ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত |
মনোরেল প্রকল্প বাতিল হলেও বন্দরনগরীর অসহনীয় যানজট থেকে মুক্তির পথ খোঁজার চেষ্টা থেমে নেই। বর্তমানে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) চট্টগ্রামের জন্য একটি সমন্বিত পরিবহন ‘মহাপরিকল্পনা’ তৈরির কাজ করছে। দক্ষিণ কোরিয়ার আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা ‘কোইকা’ এবং বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে এই মাস্টারপ্ল্যান তৈরি হচ্ছে।
সম্প্রতি ডিটিসিএ-এর একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল চট্টগ্রামের ট্রাফিক পরিস্থিতি সরজমিনে পরিদর্শন করেছে। যাত্রীদের মূল চাহিদা, রাস্তার প্রশস্ততা এবং যানজটের ধরন বিশ্লেষণ করে তারা সিদ্ধান্ত নেবে চট্টগ্রামে শেষ পর্যন্ত মেট্রোরেল, লাইট রেল ট্রানজিট (এলআরটি) নাকি মনোরেল—কোনটি সবচেয়ে বেশি কার্যকর হবে।
চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন অবশ্য শুরু থেকেই চট্টগ্রামে মনোরেল নির্মাণের পক্ষে তার জোরালো অবস্থান জানিয়ে আসছিলেন। মেট্রোরেলের তুলনায় এটি নির্মাণে খরচ কম এবং শহরের অবকাঠামোর সাথে মানানসই—এটাই ছিল তার মূল যুক্তি। এই লক্ষ্যে ডিটিসিএ-এর কাছে সিটি কর্পোরেশন একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবও জমা দিয়েছিল। মেয়রের পরিকল্পনা ছিল, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শেষ করে পরের বছরই মূল নির্মাণকাজ শুরু করার। তবে ভুয়া প্রতিনিধির প্রতারণায় আপাতত সেই স্বপ্ন বড় ধরনের হোঁচট খেল। নগরবাসীকে এখন নির্ভরযোগ্য সমাধানের জন্য ডিটিসিএ-এর প্রস্তাবিত মহাপরিকল্পনার চূড়ান্ত ফলাফলের দিকেই তাকিয়ে থাকতে হবে।
মন্তব্য