গজারিয়ায় তরুণীকে ধর্ষণের পর হত্যা

মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় নদী থেকে হালিমা আক্তার (১৯) নামের এক তরুণীর ভাসমান মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পিবিআইয়ের তদন্তে জানা গেছে, ওই তরুণীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করে মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ চারজন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে।

রোববার (৩১ মে) সন্ধ্যায় এক আনুষ্ঠানিক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে পিবিআই মুন্সীগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আসমা আরা জাহান গণমাধ্যমকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। পাওনা টাকা আদায় নিয়ে বিরোধ এবং অনৈতিক সম্পর্ক ফাঁসের জেরে সামাজিক মর্যাদাহানির আশঙ্কা থেকে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে বলে পুলিশি তদন্তে বেরিয়ে এসেছে।

পরিচয় শনাক্তকরণ ও আসামিদের গ্রেপ্তার

এর আগে, গত শুক্রবার সকালে গজারিয়ার ফুলদী নদী থেকে ভাসমান অবস্থায় হালিমা আক্তারের মরদেহ উদ্ধার করে স্থানীয় নৌ-পুলিশ। উদ্ধারের সময় মরদেহটিতে পচন ধরায় প্রাথমিকভাবে তার পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে পিবিআই মুন্সীগঞ্জের একটি বিশেষ ক্রাইম সিন টিম উন্নত তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তা গ্রহণ করে নিহতের পরিচয় নিশ্চিত করে। নিহত হালিমা আক্তার গজারিয়ার হোসেন্দী ইউনিয়নের জামালদী গ্রামের মহাসিন বেপারীর মেয়ে বলে জানা যায়।

মরদেহ উদ্ধারের পর নিহতের বোন হোসনেয়ারা আক্তার বৃষ্টি বাদী হয়ে গজারিয়া থানায় একটি সুনির্দিষ্ট হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পর পিবিআই তদন্তে নেমে হত্যাকাণ্ডে জড়িত চারজনকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিরা হলেন—আবু কালাম (৪৮), জামাল হোসেন (৪৪), রাসেল মিয়া (৪৪) এবং আল আমিন প্রধান (৫০)। গ্রেপ্তারকৃত এই চারজনই গজারিয়া উপজেলার বড় ভাটেরচর এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা।

অনৈতিক সম্পর্ক, অর্থনৈতিক বিরোধ ও পূর্বপরিকল্পনা

পিবিআইয়ের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্ত সূত্র থেকে জানা যায়, নিহত হালিমা আক্তারের সাথে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পূর্ব আর্থিক লেনদেন ও অনৈতিক সম্পর্ক ছিল। হালিমা আক্তার অভিযুক্ত আবু কালামের কাছে ২৫ হাজার টাকা এবং অপর অভিযুক্ত রাসেলের কাছে ১০ হাজার টাকা পাওনা ছিলেন। এই পাওনা টাকা নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ চলছিল।

এছাড়া, গ্রেপ্তারকৃত জামাল হোসেনের সঙ্গে হালিমার অনৈতিক শারীরিক সম্পর্ক ছিল। ঘটনার কিছু দিন আগে জামালের এক আত্মীয় তাদের এই অনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টি দেখে ফেলেন। এই ঘটনাটি এলাকায় জানাজানি বা応用 হয়ে সমাজে নিজেদের সম্মানহানি হতে পারে—এমন তীব্র আশঙ্কা থেকে অভিযুক্তরা হালিমাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

পুলিশ আরও জানায়, এই হত্যাকাণ্ডটি হুট করে ঘটানো হয়নি, বরং এটি ছিল একটি সুদূরপ্রসারী ও পরিকল্পিত ঘটনা। হত্যাকাণ্ডের মূল বাস্তবায়নের প্রায় ১৫ দিন আগে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা স্থানীয় হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে বসে হালিমাকে হত্যার চূড়ান্ত নীল নকশা বা পরিকল্পনা তৈরি করেন।

যেভাবে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়

গৃহীত পরিকল্পনা অনুযায়ী, গত ২৬ মে সন্ধ্যায় কৌশলে হালিমা আক্তারকে বড় ভাটেরচর এলাকার নদীর তীরে ডেকে আনা হয়। হালিমা সেখানে পৌঁছালে অভিযুক্তরা তাকে একটি নৌকায় তুলে নদীর ওপারে নিয়ে যান। ওপারে নির্জন স্থানে অবস্থিত একটি ভুট্টা ক্ষেতের মাঝখানে নিয়ে চারজন মিলে হালিমাকে পালাক্রমে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করেন।

ধর্ষণ শেষে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার উদ্দেশ্যে হালিমার নিজের পরনের সালোয়ার (প্যান্ট) খুলে তার গলায় পেঁচিয়ে ধরা হয়। এরপর সালোয়ার দিয়ে গলায় ফাঁস লাগিয়ে শ্বাসরোধ করে তার মৃত্যু সুনিশ্চিত করা হয়। হালিমা আক্তারের মৃত্যু হলে গভীর রাতে প্রমাণ লোপাটের উদ্দেশ্যে তার মরদেহটি ফুলদী নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়, যা পরবর্তীতে গত শুক্রবার পুলিশ উদ্ধার করে।

আদালতে আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি

রোববার বিকেলে মুন্সীগঞ্জের কোর্ট ইন্সপেক্টর সূত্রে জানা গেছে, গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা পুলিশের কাছে হত্যাকাণ্ডের সাথে নিজেদের সরাসরি সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন। এরপর তাদের কঠোর পুলিশি পাহারায় মুন্সীগঞ্জের আমলী আদালত-৫ এ হাজির করা হয়। আসামিরা বিজ্ঞ বিচারক জিনিয়া ইসলামের কাছে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় নিজ নিজ অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি প্রদান করেন।

বিজ্ঞ বিচারক আসামিদের জবানবন্দি রেকর্ড করার পর তাদের জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। পিবিআই মুন্সীগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আসমা আরা জাহান নিশ্চিত করেছেন যে, তথ্য-প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এবং দ্রুত পদক্ষেপের কারণেই অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে এই ক্লু-লেস বা রহস্যে ঘেরা সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের কিনারা করা সম্ভব হয়েছে।