খুলনা মহানগরে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদকবিরোধী চলমান বিশেষ যৌথ অভিযানে আরও ৩৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ। গত শনিবার সন্ধ্যা থেকে রোববার সকাল পর্যন্ত মহানগরীর বিভিন্ন থানা এলাকায় পৃথক পৃথক অভিযানে এসব গ্রেপ্তার সম্পন্ন হয়। এর ফলে গত চার দিনে মোট গ্রেপ্তারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২২৩ জনে। তবে পুলিশের দাবি অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, নগরীর বিভিন্ন থানা এবং গোয়েন্দা শাখার সমন্বয়ে এই বিশেষ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। অভিযানের লক্ষ্য হলো নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা এবং অপরাধচক্রের কার্যক্রম দমন করা।
Table of Contents
থানা ভিত্তিক গ্রেপ্তার তথ্য
নিচে বিভিন্ন থানায় পরিচালিত অভিযানে গ্রেপ্তারের সংখ্যা তুলে ধরা হলো—
| থানা/এলাকা | গ্রেপ্তার সংখ্যা |
|---|---|
| সদর থানা | ৯ জন |
| সোনাডাঙ্গা মডেল থানা | ৫ জন |
| লবণচরা থানা | ১ জন |
| হরিণটানা থানা | ৬ জন |
| খালিশপুর থানা | ৪ জন |
| দৌলতপুর থানা | ২ জন |
| আড়ংঘাটা থানা | ৭ জন |
| খানজাহান আলী থানা | ৫ জন |
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারদের মধ্যে ১০ জন মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এবং ১ জন চুরির মামলার আসামি। এছাড়া একাধিক চাঁদাবাজি ও হত্যাসহ মোট সাতটি মামলার আসামি কাজী রাফসান মাহমুদ, যিনি পার্থ নামেও পরিচিত, তাকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি কথিত পলাশ গ্রুপের নেতা শেখ পলাশ ওরফে চিংড়ি পলাশের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত।
ধারাবাহিক অভিযানের অগ্রগতি
খুলনায় চলমান এই বিশেষ অভিযান শুরু হয় সম্প্রতি নগরীতে সন্ত্রাসী কার্যক্রম ও মাদক বিস্তারের অভিযোগ বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে। গত বুধবার খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত বিশেষ অপরাধ বিষয়ক সভায় সমন্বিত অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এর আগে ধারাবাহিক অভিযানের অংশ হিসেবে গত মঙ্গলবার রাতে ‘গ্রেনেড বাবু’ নামে পরিচিত এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর ঘনিষ্ঠ সহযোগীসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে বুধবার রাত থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৬৩ জন, শুক্রবার ৫৯ জন এবং সর্বশেষ দিনে আরও ৬২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
অভিযান চলাকালে কিছু অস্ত্র ও যানবাহন জব্দ করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে, যা অপরাধ দমনে তাদের সক্রিয় অবস্থানকে নির্দেশ করে। পাশাপাশি অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে চারটি অস্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন করা হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় চব্বিশ ঘণ্টা টহল কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
অপরাধ পরিস্থিতি ও স্থানীয় মতামত
স্থানীয় নাগরিক সংগঠনের নেতারা মনে করেন, শুধুমাত্র নিম্নস্তরের অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে দীর্ঘমেয়াদে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। সুশাসনের জন্য নাগরিক খুলনা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক কুদরত-ই-খুদা বলেন, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় না আনলে এ ধরনের অভিযান পূর্ণ সাফল্য পাবে না।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের নজরদারির ঘাটতি ও প্রশাসনিক শিথিলতার কারণে নগরীতে একাধিক অপরাধচক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন মহলের দাবি অনুযায়ী, বর্তমানে নগরীতে অন্তত নয়টি প্রভাবশালী অপরাধচক্র সক্রিয় রয়েছে।
পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত খুলনা মহানগরে ১৬টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে একাধিক মামলায় বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার প্রমাণ তদন্তে উঠে এসেছে।
ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, চলমান অভিযান আরও জোরদার করা হবে এবং অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে। তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে শীর্ষ অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার নিয়ে প্রত্যাশা ও চাপ উভয়ই বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, টেকসই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে শুধু গ্রেপ্তার নয়, বরং সংগঠিত অপরাধচক্র ভেঙে ফেলার জন্য দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণ করা জরুরি।
