বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও সিলেটসহ সাতটি হাওর জেলায় বোরো ধান চাষাবাদে পুনরায় বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। ২০২৬ সালের মে মাসের শুরুতেই অতিবৃষ্টি এবং উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলের ফলে সৃষ্ট আগাম বন্যায় বিস্তীর্ণ অঞ্চলের ধানক্ষেত প্লাবিত হয়েছে। প্রাথমিক দাপ্তরিক হিসাব অনুযায়ী, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রায় ১ লক্ষ হেক্টর বোরো জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা সরাসরি ১ লক্ষ ৫০ হাজার কৃষক পরিবারের জীবিকাকে সংকটাপন্ন করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এই বন্যায় ধান উৎপাদনে ২ লক্ষ টনের অধিক ঘাটতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
Table of Contents
হাওর অঞ্চলের কৃষি ও বীমা ব্যবস্থার বর্তমান চিত্র
হাওর অঞ্চলের প্রধান অর্থকরী ফসল বোরো ধান হলেও, এখানকার ৯৫ শতাংশের বেশি কৃষক কোনো ধরনের বীমা সুরক্ষার আওতায় নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আগাম বন্যার প্রকোপ বাড়লেও ফসল বীমা এখনও সাধারণ চাষিদের কাছে পৌঁছাতে পারেনি। বর্তমানে কয়েকটি বেসরকারি বীমা প্রতিষ্ঠান আবহাওয়া সূচকভিত্তিক পাইলট প্রকল্প পরিচালনা করছে। এই পদ্ধতিতে উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট এবং স্থানীয় আবহাওয়া কেন্দ্রের তথ্যের ভিত্তিতে বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার হ্রাস-বৃদ্ধি বিশ্লেষণ করে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা হয়। তবে মাঠপর্যায়ে এর প্রয়োগ অত্যন্ত সীমিত।
ফসল বীমা জনপ্রিয় না হওয়ার প্রধান অন্তরায়সমূহ
হাওর অঞ্চলে ফসল বীমা ব্যবস্থা সফল না হওয়ার পেছনে মূলত চারটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে:
আস্থার সংকট ও প্রচারণার অভাব: অধিকাংশ প্রান্তিক কৃষক বীমা প্রক্রিয়াকে জটিল মনে করেন। দাবি আদায়ে হয়রানি বা টাকা ফেরত না পাওয়ার আশঙ্কায় তারা বীমা করতে আগ্রহী হন না। মাঠপর্যায়ে বীমা কোম্পানিগুলোর দৃশ্যমান তৎপরতা না থাকায় কৃষকদের মধ্যে সচেতনতা গড়ে ওঠেনি।
অধিক প্রিমিয়াম ও আর্থিক সক্ষমতা: হাওর এলাকা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় বীমা কোম্পানিগুলো উচ্চহারে প্রিমিয়াম নির্ধারণ করে। বোরো ফসলের ক্ষেত্রে এটি বীমাকৃত অংকের ৫ থেকে ৮ শতাংশ পর্যন্ত হয়। ১ একর জমির ১২ হাজার টাকা মূল্যের ফসলের জন্য ৯০০ টাকা পর্যন্ত প্রিমিয়াম দেওয়া অনেক দরিদ্র কৃষকের পক্ষে সম্ভব হয় না।
বর্গা চাষিদের অন্তর্ভুক্তি না থাকা: হাওরের একটি বড় অংশ বর্গা চাষি যারা অন্যের জমিতে চাষ করেন। বীমা করার ক্ষেত্রে জমির মালিকানা সংক্রান্ত দলিলাদির আবশ্যকতা থাকায় প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত চাষিরা এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন।
প্রাতিষ্ঠানিক ও সরকারি সীমাবদ্ধতা: বর্তমানে চলমান প্রকল্পগুলো মূলত আন্তর্জাতিক সংস্থা বা এনজিও-নির্ভর। দীর্ঘমেয়াদী সরকারি ভর্তুকি বা নির্দিষ্ট নীতিমালার অভাবে এটি পাইলট প্রকল্পের গণ্ডি পেরিয়ে বৃহৎ আকারে বাস্তবায়িত হচ্ছে না।
বিগত পাঁচ বছরে হাওরের দুর্যোগ ও ক্ষতির খতিয়ান
| বছর | দুর্যোগের ধরণ ও সময়কাল | ক্ষয়ক্ষতির সংক্ষিপ্ত বিবরণ |
| ২০২২ | আগাম বন্যা (এপ্রিল-মে) | সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনায় ব্যাপক ফসলহানি ও কৃষকের চরম দুর্দশা। |
| ২০২৩ | আকস্মিক পাহাড়ি ঢল (এপ্রিল) | আকস্মিক ঢলে কয়েক হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান তলিয়ে যায়। |
| ২০২৪ | স্বাভাবিক আবহাওয়া | আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। |
| ২০২৫ | অতিবৃষ্টি ও নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতা | বড় বন্যা না হলেও অতিবৃষ্টিতে নিচু জমিগুলোর আংশিক ক্ষতি। |
| ২০২৬ | উজান থেকে আসা ঢল ও বন্যা (মে) | ১ লক্ষ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত; ৫শ’ কোটি টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতি। |
সরকারি সহায়তা ও ভবিষ্যৎ উন্নয়ন প্রকল্প
বিদ্যমান সংকট মোকাবিলায় কৃষি মন্ত্রণালয় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তায় প্রথম ধাপে মাসিক ৭,৫০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। পাশাপাশি হাওর অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জ জেলায় নদী ও খাল খননের জন্য ১,৪২৯ কোটি টাকার একটি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এই প্রকল্পের কাজ ২০২৯ সালের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
টেকসই কৃষি সুরক্ষায় বিশেষজ্ঞদের অভিমত
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি হাওর অঞ্চলের কৃষকদের জন্য একটি সাশ্রয়ী ও বৈজ্ঞানিক বীমা কাঠামো গড়ে তোলা অপরিহার্য। এক্ষেত্রে সরকারি ভর্তুকি প্রদান, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সরাসরি ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং বর্গা চাষিদের নিবন্ধনের আওতায় আনা প্রয়োজন। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে বীমা কোম্পানি, ব্যাংক এবং স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। যথাযথ পরিকল্পনা ও কৃষকের আস্থা অর্জন করা সম্ভব হলে ফসল বীমা হাওরের কৃষি অর্থনীতিতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে একটি স্থায়ী সুরক্ষা কবচ হিসেবে কাজ করতে পারে।
