প্রযুক্তি-দুনিয়ায় একটি দীর্ঘকালীন প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে, প্রযুক্তি যত বেশি উন্নত, গতিশীল ও আকারে ছোট হবে, তার পেছনে প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার বা অপচয় ততটাই হ্রাস পাবে। কিন্তু বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত প্রযুক্তি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (Artificial Intelligence)-এর ক্ষেত্রে এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল এবং বিপরীত প্রমাণিত হতে চলেছে। এআই প্রযুক্তির নেপথ্যে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাওয়া বিশালাকার ডেটা সেন্টারের সার্ভারসহ এর বিশাল অবকাঠামো বাস্তবে পৃথিবীর সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদকে দ্রুত নিঃশেষ করে দিচ্ছে। জাতিসংঘের আওতাধীন শিক্ষামূলক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইউনাইটেড নেশনস ইউনিভার্সিটি’ (UNU)-এর সাম্প্রতিক এক বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদনে এ বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে সতর্ক করে বলা হয়েছে, এআই ডেটা সেন্টারের অভাবনীয় প্রসারের কারণে ভবিষ্যতে বিশ্বজুড়ে বিদ্যুৎ, পানি এবং ভূমির চাহিদা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাবে, যা পরিবেশগত ভারসাম্যকে তীব্র ঝুঁকির মুখে ফেলবে।
শীতলীকরণ প্রক্রিয়া ও পানির বিপুল ব্যবহার
ইউনাইটেড নেশনস ইউনিভার্সিটির গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত ডেটা সেন্টারের উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সার্ভারগুলো যখন দিনরাত ২৪ ঘণ্টা বিরতিহীনভাবে জটিল হিসাব-নিকাশের কাজ পরিচালনা করে, তখন সেখানে প্রচুর পরিমাণে তাপ উৎপন্ন হয়। এই অতিরিক্ত তাপের কারণে সার্ভারগুলো যেন বিকল বা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেজন্য ডেটা সেন্টারের তাপমাত্রা একটি নির্দিষ্ট স্তরে বজায় রাখতে হয়। আর এই বিশাল তাপমাত্রাকে প্রশমিত বা ঠান্ডা রাখতে বিশেষায়িত কুলিং সিস্টেম (শীতলীকরণ ব্যবস্থা) ব্যবহার করা হয়, যা পরিচালনায় প্রতিদিন লাখ লাখ লিটার বিশুদ্ধ পানির প্রয়োজন পড়ে।
প্রতিবেদনে ভবিষ্যৎ ঝুঁকির একটি ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে বলা হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বর্তমান ও ক্রমবর্ধমান বৃদ্ধির ধারা যদি এভাবেই অব্যাহত থাকে, তবে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে এই প্রযুক্তির অবকাঠামো ঠান্ডা রাখতে যে পরিমাণ পানির প্রয়োজন হবে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। হিসাব অনুযায়ী, সেই পানির পরিমাণ বিশ্বের প্রায় ১৩০ কোটি (১.৩ বিলিয়ন) মানুষের দৈনিক বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক পানির চাহিদার সমান। ফলে এই প্রযুক্তিগত চাহিদা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ বিশুদ্ধ পানির স্তরের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে এবং মানুষের সুপেয় পানির অধিকারকে সংকুচিত করছে।
বিদ্যুৎ চাহিদার ক্ষেত্রে ডেটা সেন্টারের প্রভাব
শুধুমাত্র পানির চাহিদাই নয়, বিদ্যুৎ শক্তি ব্যবহারের দিক থেকেও এআই ডেটা সেন্টারগুলো বর্তমান বিশ্বে একেকটি বিশাল দানবে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এআই ডেটা সেন্টারগুলো সম্মিলিতভাবে যে পরিমাণ বৈদ্যুতিক শক্তি প্রতিনিয়ত গ্রাস করছে, তার মোট পরিমাণ একটি মাঝারি আকারের দেশের সামগ্রিক বার্ষিক বিদ্যুৎ ব্যবহারের সমান।
সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো, এই বিদ্যুতের ব্যবহার কোনো একটি নির্দিষ্ট স্তরে এসে থমকে নেই বা স্থিতিশীল হচ্ছে না। বিশ্বজুড়ে শত শত কোটি সাধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবহারকারী যখন চ্যাটবট ব্যবহারের মাধ্যমে এআইকে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন জটিল প্রশ্ন করেন, কোডিং করেন কিংবা কৃত্রিম ছবি (AI Images) ও ভিডিও তৈরি করেন, তখন ডেটা সেন্টারের প্রসেসরের ওপর কাজের চাপ এবং ফলশ্রুতিতে বিদ্যুতের চাহিদাও জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে। জাতিসংঘের এই প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক মোট বিদ্যুৎ চাহিদার একটি বিশাল অংশ এককভাবে এই এআই খাত দখল করে নেবে, যা বিশ্বের বিদ্যমান বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।
ভৌগোলিক কেন্দ্রীকরণ ও কার্বন নির্গমনের ঝুঁকি
ইউনাইটেড নেশনস ইউনিভার্সিটির প্রতিবেদনে এআই অবকাঠামোর ভৌগোলিক কেন্দ্রীকরণের মতো আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিষয় বিশদভাবে তুলে ধরা হয়েছে। বর্তমানে পুরো বিশ্বের সচল এআই ডেটা সেন্টারগুলোর সিংহভাগের অবস্থান মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনে। এর ফলে এই প্রযুক্তিগত বিপুল অগ্রগতির পেছনে যে স্থানীয় পরিবেশগত বিপর্যয়, পানির সংকট এবং অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারের চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, তা সরাসরি ভোগ করতে হচ্ছে এই নির্দিষ্ট দুটি অঞ্চলের অধিবাসীদের। অন্যদিকে, বিশ্বের অন্যান্য অধিকাংশ দেশ মূলত এই পরিবেশগত মূল্যের অংশীদার না হয়ে কেবল এই সুবিধার ভোক্তা হিসেবেই রয়ে গেছে।
প্রতিবেদনে আরও সতর্ক করা হয়েছে যে, পরিচ্ছন্ন শক্তি বা পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য জ্বালানির (Renewable Energy) ব্যবহার নিশ্চিত না করে যদি প্রথাগত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভর করেই এআই ডেটা সেন্টারের সংখ্যা এভাবে দিন দিন বাড়তে থাকে, তবে তা বৈশ্বিক কার্বন নির্গমনের মাত্রাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। ফলস্বরূপ, জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের গতি আরও ত্বরান্বিত হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই পরিবেশগত খরচের বিষয়টি তাই বর্তমানে বৈশ্বিক বিজ্ঞানী ও নীতিনির্ধারকদের ভাবিয়ে তুলছে।
