খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ই মার্চ ২০২৬, ১১:৩৫ পিএম

কুমিল্লার পদুয়ার বাজার লেভেল ক্রসিংয়ে ভয়াবহ বাস–ট্রেন সংঘর্ষে ১২ জন নিহত এবং অন্তত ১০ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। এই দুর্ঘটনায় একমাত্র বাবার জীবন বেঁচে গেলেও, তার স্ত্রী ও দুই কন্যার জীবন নিভে গেছে। রবিবার দুপুরে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লাশঘরে নিহতদের লাশ গ্রহণ করতে স্বজনদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো, যেখানে কান্না আর হাহাকার আর থামছিল না।
Table of Contents
শনিবার রাত ২টা ৫৫ মিনিটে, ঈদের দিন, চুয়াডাঙ্গা থেকে লক্ষ্মীপুরগামী মামুন স্পেশাল পরিবহনের একটি বাস পদুয়ার বাজার রেল ক্রসিংয়ে ঢাকাগামী মেইল ট্রেনের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। এতে সাতজন পুরুষ, দুই নারী ও তিন শিশুসহ মোট ১২ জন প্রাণ হারান। গুরুতর আহত অন্তত ১০ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানায়, দুর্ঘটনার মূল কারণ ছিল ক্রসিংয়ে দায়িত্বরত গেটম্যানদের অবহেলা। দুই গেটম্যানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার বাসিন্দা পিন্টু ইসলাম নিজের জীবন বাঁচাতে সক্ষম হলেও তাঁর স্ত্রী লাইজু আক্তার (২৬) এবং দুই কন্যা খাদিজা (৬) ও মরিয়ম আক্তার (৩) নিহত হয়েছেন। তারা বাসের মাঝামাঝি স্থানে ছিলেন, যেখানে ট্রেনের সংঘর্ষে বাস দুমড়েমুচড়ে যায়। পিন্টু ইসলাম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার ছোট্ট মেয়েগুলো কত কষ্ট পেয়ে যে মরেছে, আল্লাহ ভালো জানে। আল্লাহ আমারে বাঁচিয়ে রাখল কেন?” তিনি আরও অভিযোগ করেন, “এটা দুর্ঘটনা নয়, হত্যা। ব্যারিয়ার ঠিকমতো ফেলা হলে হয়তো এমন ঘটত না।”
ঝিনাইদহের আরও এক যাত্রী জুহাদ বিশ্বাস (২৪) নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার পথে প্রাণ হারান। তার স্ত্রী রুমি আক্তার ও সন্তানরা লাশ নিতে এসে কাতর কাঁদছিলেন।
| নাম | বয়স | গ্রামের নাম | অবস্থা |
|---|---|---|---|
| লাইজু আক্তার | ২৬ | রামগতি, লক্ষ্মীপুর | নিহত |
| খাদিজা আক্তার | ৬ | রামগতি, লক্ষ্মীপুর | নিহত |
| মরিয়ম আক্তার | ৩ | রামগতি, লক্ষ্মীপুর | নিহত |
| জুহাদ বিশ্বাস | ২৪ | গোপাল পানানিয়া, ঝিনাইদহ | নিহত |
| সিরাজুল ইসলাম | ৭০ | মোক্তারপুর, যশোর | নিহত |
| কোহিনুর বেগম | ৫৫ | মোক্তারপুর, যশোর | নিহত |
| তাজুল ইসলাম | ৬৭ | চাপাতলি, চাঁদপুর | নিহত |
| বাবুল চৌধুরী | ৫৫ | সোনাইমুড়ি, নোয়াখালী | নিহত |
| ফচিয়ার রহমান | ২৬ | মোহাম্মদপুর, মাগুরা | নিহত |
| সোহেল রানা | ২৫ | জীবননগর, চুয়াডাঙ্গা | নিহত |
| নজরুল ইসলাম (রায়হান) | ৪৫ | ফাজিলপুর, বেগমগঞ্জ | নিহত |
| সাঈদা | ৯ | মিয়ারবেরি, লক্ষ্মীপুর | নিহত |
দুর্ঘটনায় আহতদের মধ্যে সিরাজউদ্দৌলা ও তাঁর স্ত্রী ও কন্যাও গুরুতর আহত। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাদের ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়েছে।
রেলওয়ে পুলিশ ও স্থানীয় কর্মকর্তারা লাশ হস্তান্তরের সময় উপস্থিত ছিলেন। স্বজনরা রেল কর্তৃপক্ষের অবহেলার জন্য ন্যায্য বিচার দাবি করেছেন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই দুর্ঘটনা দেশের রেল নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতার এক কঠোর উদাহরণ। দ্রুত তদন্ত ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা না হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ভয়াবহ দুর্ঘটনার আশঙ্কা বৃদ্ধি পাবে।
ছোট অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার কারণে এক মুহূর্তে পুরো পরিবার ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। পিন্টু ইসলামের মতো যাদের স্ত্রী ও সন্তান হারিয়েছে, তাদের মানসিক ক্ষতি, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব দীর্ঘমেয়াদী হবে। এই ঘটনা দেশের সকলের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করছে যে নিরাপত্তা ব্যবস্থার অবহেলা কখনো মাপা যায় না।
মন্তব্য