খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ই নভেম্বর ২০২৫, ১০:১৫ এএম

পর্যটন নগরী কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলায় এক লোমহর্ষক ও বর্বরোচিত ঘটনার উন্মোচন হয়েছে। উপজেলার হলদিয়াপালং ইউনিয়নের তচ্ছাখালী ব্রিজের পাশে একটি নির্জন খাল থেকে এক অজ্ঞাতনামা নারীর বস্তাবন্দী অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় জনপদে ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র চাঞ্চল্য ও আতঙ্ক। মরদেহের পচনশীল অবস্থা দেখে ধারণা করা হচ্ছে, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড এবং অপরাধ ঢাকতেই অত্যন্ত সুকৌশলে মরদেহটি লোকচক্ষুর আড়ালে খালের মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছিল।
Table of Contents
গত ১৪ নভেম্বর, বৃহস্পতিবার বিকেলের দিকে স্থানীয় বাসিন্দারা তচ্ছাখালী ব্রিজের নিচে খালের ধারে একটি বড় পরিত্যক্ত বস্তা পড়ে থাকতে দেখেন। বস্তাটি থেকে অসহনীয় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়দের সন্দেহ ঘনীভূত হয়। খবর পেয়ে উখিয়া থানা পুলিশের একটি বিশেষ দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। সন্ধ্যা নাগাদ পুলিশ বস্তাটি উদ্ধার করে এবং তা খোলার পর ভেতরে এক মধ্যবয়সী নারীর অর্ধগলিত মৃতদেহ দেখতে পায়।
উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিয়াউল হক জানিয়েছেন যে, দীর্ঘ সময় ধরে পানির সংস্পর্শে থাকায় এবং আবহাওয়াগত কারণে মরদেহটিতে পচন ধরেছে। বিশেষ করে মরদেহের মুখমণ্ডল ও শরীরের অধিকাংশ অংশ বিকৃত হয়ে যাওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। পুলিশের প্রাথমিক ফরেনসিক ধারণা অনুযায়ী, এই হত্যাকাণ্ডটি অন্তত এক সপ্তাহ আগে সংঘটিত হয়েছে। দুর্বৃত্তরা অন্য কোনো স্থানে হত্যা নিশ্চিত করে প্রমাণ লোপাটের উদ্দেশ্যে নির্জন এই স্থানটিকে বেছে নিয়ে থাকতে পারে।
উদ্ধারকৃত মরদেহটি সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত শেষে ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং মৃত্যুর আগে তাঁর ওপর কোনো শারীরিক বা যৌন নির্যাতন চালানো হয়েছিল কি না, সে সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
ওসি জিয়াউল হক আরও জানান, “আমরা বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছি। মরদেহের পরিচয় শনাক্তের জন্য পার্শ্ববর্তী রামু, টেকনাফ ও কক্সবাজার সদর থানায় সাম্প্রতিক নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকা সংগ্রহ করা হচ্ছে। এছাড়া সিআইডি ও পিবিআই-এর কারিগরি সহায়তা নেওয়ারও প্রক্রিয়া চলছে।”
উক্ত মর্মান্তিক ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো নিচের সারণিতে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
| বিষয় | বিস্তারিত তথ্য |
| মরদেহের পরিচয় | অজ্ঞাতনামা নারী (পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে)। |
| উদ্ধারের স্থান | তচ্ছাখালী ব্রিজ সংলগ্ন খাল, হলদিয়াপালং, উখিয়া। |
| উদ্ধারের তারিখ ও সময় | ১৪ নভেম্বর, বৃহস্পতিবার (সন্ধ্যা)। |
| মরদেহের অবস্থা | বস্তাবন্দী, অর্ধগলিত এবং বিকৃত। |
| মৃত্যুর আনুমানিক সময় | অন্তত ৭-১০ দিন আগে। |
| বর্তমান অবস্থান | ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালে প্রেরিত। |
| তদন্তকারী সংস্থা | উখিয়া থানা পুলিশ। |
হলদিয়াপালং ইউনিয়নের এই এলাকাটি সাধারণত শান্ত হিসেবে পরিচিত হলেও খালের ধারে এমন পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের আলামত মেলায় স্থানীয়দের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিয়েছে। এলাকাবাসীর মতে, উখিয়া এলাকাটি ভৌগোলিক কারণে অত্যন্ত স্পর্শকাতর। এখানে বিপুল পরিমাণ ভাসমান জনগোষ্ঠী এবং রোহিঙ্গাদের যাতায়াত থাকায় অপরাধীরা অনেক সময় অপরাধ করে সহজেই আত্মগোপন করতে পারে।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, নারীর পরিচয় উদ্ঘাটন করা গেলে খুনিদের ধরা সহজ হবে। তাঁরা দাবি তুলেছেন যে, তচ্ছাখালী ব্রিজের মতো নির্জন স্থানগুলোতে রাতের বেলা পুলিশের টহল বৃদ্ধি করা এবং প্রধান সড়কগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, যেহেতু চেহারা চেনা যাচ্ছে না, তাই পরিচয় শনাক্তে তারা এখন ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা আঙুলের ছাপ সংগ্রহের চেষ্টা করছে। যদি ভুক্তভোগীর জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) ডেটাবেসে তথ্য থাকে, তবে দ্রুত পরিচয় পাওয়া সম্ভব। তবে মরদেহটি বেশি পচে যাওয়ায় আঙুলের চামড়া অক্ষত আছে কি না, তা নিয়ে কিছুটা সংশয় রয়েছে। পরিচয় পাওয়া না গেলে ডিএনএ (DNA) পরীক্ষার মাধ্যমে ভবিষ্যতে পরিচয় নিশ্চিত করার পথ খোলা রাখা হবে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে ব্যক্তিগত শত্রুতা, পারিবারিক কলহ কিংবা কোনো সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের হাত থাকতে পারে। সাধারণত পরিচয় গোপন রাখতে এবং প্রমাণ নষ্ট করতেই মরদেহ বস্তাবন্দী করে নির্জন স্থানে ফেলা হয়। পুলিশ এখন এলাকার নিখোঁজ ডায়েরিগুলো (GD) খতিয়ে দেখছে। একইসাথে টেকনাফ-কক্সবাজার সড়কে যাতায়াতকারী সন্দেহভাজন যানবাহনের গতিবিধি সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
পরিশেষে বলা যায়, সমাজের এই চরম নৈতিক অবক্ষয় ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো আমাদের নিরাপত্তার অভাবকে নগ্নভাবে ফুটিয়ে তোলে। একজন অজ্ঞাত নারীর এমন করুণ পরিণতি বিচারহীনতার সংস্কৃতির অংশ যেন না হয়, সেটিই এখন স্থানীয়দের কাম্য। প্রশাসনের তৎপরতা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি পেলে হয়তো খুব দ্রুতই এই জঘন্য অপরাধের পেছনের কুশীলবদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।
মন্তব্য