বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এম এ হান্নান এক অবিস্মরণীয় নাম। তিনি ছিলেন একাধারে ভাষা সৈনিক, শ্রমিক নেতা, আওয়ামী লীগের দক্ষ সংগঠক এবং মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম অগ্রপথিক। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করে তিনি ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম চিরস্থায়ী করে যান। ১৯৩০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার খাসপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করা এই মহান নেতা ১৯৭৪ সালের ১২ জুন মাত্র ৪৪ বছর বয়সে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। তাঁর জীবন ও রাজনৈতিক কর্মতৎপরতার সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:
Table of Contents
প্রাথমিক জীবন ও রাজনৈতিক দীক্ষা
এম এ হান্নানের জন্ম ১৯৩০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার তেহট্ট থানার খাসপুর গ্রামে। দেশভাগের পর তাঁর পরিবার মেহেরপুরে চলে আসে। ছাত্রজীবনেই তিনি রাজনৈতিকভাবে সচেতন হয়ে ওঠেন এবং ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। পেশাগত জীবনে তিনি ব্যাংক কর্মকর্তা ও বীমা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও, তাঁর মূল মনোযোগ ছিল জনকল্যাণ ও রাজনীতিতে।
রাজনৈতিক অবদান ও শ্রমিক আন্দোলন
তিনি শ্রমিক অধিকার আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। জাতীয় শ্রমিক লীগ, বাংলাদেশ রেল শ্রমিক লীগ এবং চট্টগ্রামের শ্রমিক আন্দোলনের সাথে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক ছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সংঘটিত প্রতিটি আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ছিলেন।
ছয় দফা আন্দোলন (১৯৬৬): বাঙালির মুক্তির সনদ হিসেবে খ্যাত এই আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা।
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা বিরোধী আন্দোলন (১৯৬৮): বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ।
ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান: চট্টগ্রামের ছাত্র-জনতাকে সংগঠিতকরণে বিশেষ অবদান।
সোয়াত জাহাজ প্রতিরোধ (১৯৭১): ২৪ মার্চ চট্টগ্রাম বন্দরে পাকিস্তানি বাহিনীর অস্ত্রবাহী ‘সোয়াত’ জাহাজের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার অন্যতম প্রধান সংগঠক।
মহান মুক্তিযুদ্ধ ও ঐতিহাসিক ভূমিকা
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতার পর বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার বার্তা জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেন এম এ হান্নান। ২৬ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তিনি বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন, যা অবরুদ্ধ বাঙালি জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করেছিল। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তিনি ভারতের আগরতলায় গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করেন এবং হরিনা যুবশিবির প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
জীবনপঞ্জি ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাবলি
| বিষয় | বিবরণ |
| জন্ম | ১০ ফেব্রুয়ারি, ১৯৩০; খাসপুর, নদীয়া, পশ্চিমবঙ্গ। |
| শিক্ষাজীবন ও পেশা | মেহেরপুরে থিতু হওয়া, পরবর্তীতে ব্যাংক কর্মকর্তা ও বীমা ব্যবস্থাপক। |
| রাজনৈতিক পরিচয় | সহ-সভাপতি/সাধারণ সম্পাদক (চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগ), শ্রমিক নেতা। |
| ঐতিহাসিক অবদান | ২৬ মার্চ, ১৯৭১ তারিখে কালুরঘাট থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ। |
| যুদ্ধকালীন ভূমিকা | আগরতলায় মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিতকরণ ও হরিনা যুবশিবির প্রতিষ্ঠা। |
| মৃত্যু | ১২ জুন, ১৯৭৪ (১১ জুন চৌদ্দগ্রামে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর ফেনী হাসপাতালে)। |
| রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি | ২০১৩ সালে মরণোত্তর ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ প্রদান। |
মহাপ্রয়াণ ও স্বীকৃতি
স্বাধীনতার পর দেশ পুনর্গঠনে আত্মনিয়োগ করলেও ১৯৭৪ সালের ১১ জুন কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি গুরুতর আহত হন। পরবর্তীকালে ১২ জুন ফেনী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে তাঁর এই অনন্য ত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার ২০১৩ সালে তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ (মরণোত্তর) প্রদান করে।
